ভারতের নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ বিভেদ ও বিতর্কিত নীতি নিয়ে নজিরবিহীন আন্তর্জাতিক প্রশ্ন

বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রবিন্দুতে এক অভূতপূর্ব নজিরবিহীন সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। দেশটির নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিতর্কিত নীতি প্রণয়ন সংক্রান্ত চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ পাওয়ার পর বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম হয়েছে। সমালোচকদের মতে, এই বিতর্কিত নীতিমালাগুলোর কারণে লাখ লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যা সামগ্রিক গণতান্ত্রিক কাঠামোর নিরপেক্ষতা নিয়ে গভীর প্রশ্নের উদ্রেক করেছে।

স্বায়ত্তশাসিত সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত ভারতের নির্বাচন কমিশন বহু দশক ধরে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে তাদের বিশাল কর্মযজ্ঞ এবং জটিল নির্বাচনী প্রক্রিয়া সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিল। কিন্তু সম্প্রতি একটি শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উন্মোচিত হয়েছে যে, কমিশনের বর্তমান প্রধান জ্ঞানেশ কুমার ভোটার ডেটাবেজের চলমান পরিবর্তনগুলোর স্বচ্ছতা ও অখণ্ডতা নিয়ে অপর দুই সমপদমর্যাদার কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশীর উত্থাপিত আপত্তি ও উদ্বেগগুলোকে বারবার পাশ কাটিয়ে গেছেন।

আইন অনুযায়ী তিন সদস্যের এই কমিশনকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা থাকলেও, গত ১০ মাসে সান্ধু ও যোশী কমিশনার প্রধানের গৃহীত একতরফা পদক্ষেপগুলোর বিরুদ্ধে অন্তত ১৪ বার আনুষ্ঠানিক ও লিখিতভাবে আপত্তি জানিয়েছেন। সুখবীর সিং সান্ধু এই একতরফা পদক্ষেপগুলোকে অননুমোদিত এবং অবৈধ হিসেবে অভিহিত করেছেন। নতুন ভোটার নিবন্ধন ম্যান্ডেট, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল, এবং তালিকার নিরাপত্তাসহ প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে কমিশনের অভ্যন্তরে তীব্র মতবিরোধ ও অনৈক্যের বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে।

এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশের ফলে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দলগুলো দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে যে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন বিতর্কিত ও পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করছে। সমালোচকদের দাবি, ভোটার তালিকা থেকে নাম কেটে ফেলার এই প্রক্রিয়ায় সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল অংশ, সংখ্যালঘু এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উল্লেখ্য, ভারতে ভোটাধিকার কেবল ব্যালট পেপারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এর সঙ্গে বিভিন্ন সরকারি কল্যাণমূলক প্রকল্পের প্রাপ্তিও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

ভারতের নির্বাচন কমিশনের সাবেক প্রধান এস ওয়াই কোরেশী আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বর্তমান পরিস্থিতিকে অত্যন্ত হতাশাজনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, অতীতে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানটি আজ তার সেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই অভ্যন্তরীণ বিভেদের তথ্য জনসমক্ষে আসার ফলে দেশটির নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা আরও বেশি সংকটের মুখে পড়বে এবং ভবিষ্যতে বিশ্বমঞ্চে ভারতের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে।

০%
০%
০%
০%