নব্বইয়ের দশকের জনপ্রিয় দুর্গা সংযুক্তার কানাডাবাস ও অজানা অধ্যায়

নব্বইয়ের দশকে দূরদর্শনের মহালয়ার জনপ্রিয় দুর্গা সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফেলে আসা সোনালী দিন ও বর্তমান প্রবাস জীবন নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন

প্রযুক্তির চকচকে সেট কিংবা চটজলদি গ্রাফিক্সের যুগ নয়, সেকালে বাঙালির শারদীয় ভোরে মহালয়ার আবাহন মানেই ছিল দূরদর্শনের পর্দায় এক অন্য আমেজ। ১৯৯৪ সালের মহালয়ার ভোরে প্রথমবার দূরদর্শনের পর্দায় দশভুজা দুর্গার রূপ ধারণ করে যিনি কোটি বাঙালির হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন, তিনি হলেন প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী সংযুক্তা বন্দ্যোপাধ্যায়। বীরেন ভদ্রের অমিত্রাক্ষর চণ্ডীপাঠ আর উদয় শঙ্কর ঘরানার ঐতিহ্যবাহী নাচের সেই সোনালী সময়ে টেলিভিশনের পর্দায় দেবী দুর্গার মুখ হিসেবে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক অতুলনীয় নজির, যা আজও দর্শকদের স্মৃতির পাতায় অমলিন।

ছোটবেলা থেকেই নৃত্যকলার প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল সংযুক্তার। লোকনৃত্য ও কত্থক দিয়ে শুরু হলেও প্রখ্যাত নৃত্যশিল্পী যামিনী কৃষ্ণমূর্তির পরিবেশনা দেখার পর ভরতনাট্যমের জাদুতে মুগ্ধ হন তিনি। পরবর্তী সময়ে গুরু গোবিন্দন কুট্টি ও থাঙ্কমণি কুট্টির সুপরিচিত কলামণ্ডলম্ নাচের স্কুলে সুদীর্ঘ ও কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৯৪ সালে শ্রী শিক্ষায়তন কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী থাকাকালীন দূরদর্শনের প্রতিনিধিরা কলামণ্ডলমে আসেন মহালয়ার বিশেষ অনুষ্ঠানটির জন্য উপযুক্ত শিল্পী নির্বাচনের উদ্দেশ্যে, আর সেখানেই দেবী দুর্গার রূপায়ণের জন্য নিখুঁত পছন্দ হিসেবে নির্বাচিত হন তরুণী সংযুক্তা।

পর্দায় জীবন্ত দেবী দুর্গা হয়ে ওঠার সেই যাত্রাটি ছিল অত্যন্ত কণ্টকাকীর্ণ ও পরিশ্রমের। ফাইটমাস্টারের নির্দেশনায় অস্ত্র চালনা এবং মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধের দৃশ্য নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতে চলত দিনব্যাপী নিবিড় ওয়ার্কশপ। রেকর্ডিংয়ের দিনগুলোতে তিনি সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করতেন এবং মানসিক দিক থেকে ভক্তিভাব বজায় রাখতেন। ভারী মাটির তৈরি অতিরিক্ত আটটি কৃত্রিম হাত শরীরে বেঁধে একটানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা শ্যুটিং করতে হতো, যার ফলে পিঠে কালসিটে দাগ পড়ে গেলেও ক্যামেরার সামনে তাঁর প্রশান্ত মুখাবয়ব ও নাচের নিখুঁত মুদ্রায় তার সামান্য আঁচও পড়তে দেননি তিনি।

বর্তমানে বিনোদন জগতের চাকচিক্য ও প্রচারের আলো থেকে বহুদূরে অবস্থান করছেন এই গুণী শিল্পী। বিয়ের সুবাদে দীর্ঘকাল ধরে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছেন কানাডার টরন্টো শহরে। সেখানে বসেই নৃত্য নিয়ে গভীর গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের ভরতনাট্যমের দীক্ষা দিয়ে চলেছেন তিনি। জন্মভূমি থেকে হাজার মাইল দূরে থেকেও বিদেশের মাটিতে আয়োজিত শারদোৎসবে দশভুজা রূপে তাঁর নাচের বাদশার আসন আজও অটুট। প্রচারের আলো এড়িয়ে নিঃশব্দে আজও নৃত্যসাধনাকেই নিজের জীবনের ব্রত হিসেবে বেছে নিয়েছেন দূরদর্শনের সেই অদ্বিতীয় দেবী দুর্গা।

ব্যক্তিগত জীবনে মাতৃত্বের গৌরবেও ভাস্বর এই শিল্পী, তাঁর পুত্র ঋতিষ্মান ইতিমধ্যেই মায়ের উচ্চতা ছাড়িয়ে সাফল্যের নতুন সিঁড়ি বেয়ে চলেছেন। মাস কয়েক আগে সংযুক্তা গর্বের সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছিলেন যে তাঁর পুত্র কানাডার ওন্টারিওতে দ্বাদশ শ্রেণীতে আশাতীত সাফল্য অর্জন করে স্বনামধন্য 'ওন্টারিও স্কলার' খেতাব অর্জন করেছেন। পাশাপাশি তিনি সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির বিশেষায়িত এসএইচএসএম প্রোগ্রাম, যার মাধ্যমে তিনি অর্জন করেছেন আধুনিক প্রযুক্তির প্রায়োগিক ও পেশাদার জ্ঞান।

০%
০%
০%
০%