AdvertisementAdvertisement

কিশোর কুমারের বৈচিত্র্যময় জীবন ও রহস্যময় কিংবদন্তির আখ্যান

একজন শিল্পীর জীবনের সমস্ত রঙ কতটুকু বিচিত্র হতে পারে, তার জ্বলন্ত উদাহরণ কিংবদন্তি কিশোর কুমার। রেকর্ডিং স্টুডিওর মাইক্রোফোনের সামনে তিনি যেমন বিরহ ও প্রেমের অনন্য জাদুকর, রুপালি পর্দায় তেমনই দুরন্ত কৌতুকাভিনেতা। সুরকার, পরিচালক, চিত্রনাট্যকার কিংবা প্রযোজক—মঞ্চের প্রতিটি ভূমিকায় তিনি ছিলেন একাধারে তুখোড় ও সাবলীল। অথচ এই আলোর বৃত্তের বাইরে তিনি ছিলেন এক রহস্যময় নিভৃতচারী, যাঁকে বুঝতে গিয়ে সমসাময়িক শিল্পীরাও বারবার ধাঁধায় পড়েছেন। আজ এই বহুমাত্রিক শিল্পীর জন্মদিনে ফিরে দেখা যাক তাঁর বর্ণিল জীবনের অলিগলি।

কিশোর কুমারের জীবনে ‘চার’ সংখ্যাটি যেন এক অবিচ্ছেদ্য রহস্য। ১৯২৯ সালের ৪ আগস্ট জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ছিলেন মা-বাবার চতুর্থ সন্তান। শোনা যায়, তাঁর জন্ম হয়েছিল ভোর ৪টায়। শুধু তাই নয়, ব্যক্তিগত জীবনে তিনি বিয়ে করেছিলেন চারবার এবং প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সংখ্যাও ছিল চারটি। এই সমাপতনগুলো আজও তাঁর ভক্তদের কাছে এক কৌতূহলোদ্দীপক আলোচনার বিষয়।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

মধ্যপ্রদেশের খান্ডোয়ার এক মধ্যবিত্ত পরিবারে আভাস কুমার গাঙ্গুলি হিসেবে তাঁর জন্ম। বাবা কুঞ্জলাল গাঙ্গুলি ছিলেন আইনজীবী। শৈশব থেকেই অন্যের কণ্ঠ হুবহু অনুকরণ করায় ছিল তাঁর অসাধারণ দক্ষতা। বিশেষভাবে প্রখ্যাত গায়ক কে এল সায়গলের গায়কিতে মুগ্ধ কিশোর কিশোর বয়সেই বোম্বে টকিজে নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখেন। ১৯৪৮ সালে ‘জিদ্দি’ সিনেমার ‘মরনে কি দুয়ায়ে কিউ মাঙ্গু’ গানটির মাধ্যমে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে তাঁর যে জয়যাত্রা শুরু হয়, তা পরবর্তী কয়েক দশকে ভারতীয় সংগীতের এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে যায়।

সংগীতে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তালিম না থাকা সত্ত্বেও কিশোর কুমার নিজের এক স্বতন্ত্র ধারা তৈরি করেছিলেন। তাঁর কণ্ঠে দেব আনন্দ, রাজেশ খান্না কিংবা অমিতাভ বচ্চনের মতো তারকারা পর্দায় প্রাণ পেয়েছিলেন। বাংলা থেকে হিন্দি, প্রতিটি ভাষায় তাঁর সাবলীল উপস্থিতি শ্রোতাদের সম্মোহন করেছে। ‘আমার মনের এই ময়ূর মহলে’ থেকে শুরু করে ‘নয়ন সরসী কেন ভরেছে জলে’—তাঁর প্রতিটি গানেই ছিল এক অদ্ভুত মায়া।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

কিশোরের ব্যক্তিজীবন নিয়ে গুজবের অন্ত ছিল না। বাড়িতে মানুষের মাথার খুলি ও কঙ্কাল রাখা এবং তা নিয়ে ঘুমোনোর মতো অদ্ভুত সব গল্পের আড়ালে ছিল তাঁর শৌখিন সংগ্রহশালা। আফ্রিকার সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ থেকে এসব এন্টিক সামগ্রী সংগ্রহ করেছিলেন তিনি, যার নেপথ্যে কোনো ভয়ের বিষয় ছিল না। একইভাবে, তাঁর বাড়ির মেঝের গোপন ফাঁদ নিয়ে ছড়িয়ে পড়া মিথটিও ছিল নেহাতই ভিত্তিহীন। প্রযোজক এস ডি নারাংয়ের মতো মানুষও এই গুজবে বিশ্বাস করে তাঁর বাড়িতে পরীক্ষা করতে গিয়েছিলেন, যা কিশোরের জীবনকে ঘিরে থাকা রহস্যের এক মজাদার উদাহরণ।

সবচেয়ে বড় সত্য হলো, কিশোর কুমার ছিলেন নিজের শর্তে বেঁচে থাকা এক মানুষ। প্রযোজক বা সমালোচকদের সঙ্গে নানা টানাপোড়েন তাঁকে ‘পাগলাটে’ তকমা দিলেও, তিনি বলতেন—পৃথিবীটা নিজেই পাগল, তাই তাঁকে পাগল বললে কোনো আপত্তি নেই। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি চেয়েছিলেন কৃত্রিমতা ছেড়ে জন্মভূমি খান্ডোয়ায় ফিরে যেতে। যদিও সেই ফেরা আর হয়নি, ১৯৮৭ সালের ১৩ অক্টোবর বড় ভাই অশোক কুমারের জন্মদিনের দিনই তিনি পাড়ি জমান না ফেরার দেশে। আজ ৫৮ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে রেখে যাওয়া সেই অমলিন সুর ও প্রতিভার দ্যুতিতে বারবার উদ্ভাসিত হন কিশোর কুমার।

0%
0%
0%
0%