অভিনেতা রঙ্গনাথের শেষ ইচ্ছা ও মানবিকতার এক অনন্য নজির

তেলুগু চলচ্চিত্র জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র তিরুমালা সুন্দর শ্রী রঙ্গনাথ। দীর্ঘ চার দশকেরও বেশি সময় ধরে রুপালি পর্দায় দাপিয়ে বেড়ানো এই প্রথিতযশা অভিনেতা নিজের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন আর নান্দনিক অভিনয়ের জন্য আজও দর্শকদের হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন। তবে তাঁর বর্ণময় ক্যারিয়ারের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে জীবনের শেষ অধ্যায়ে ঘটে যাওয়া এক মানবিক ও হৃদয়বিদারক ঘটনা। ২০১৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর ৬৬ বছর বয়সে চিরবিদায় নেওয়া এই কিংবদন্তি অভিনেতার প্রস্থান ছিল বিষাদময়, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শেষ ইচ্ছার বাস্তবায়ন আজও অবাক করে মানুষকে।
কর্মজীবনের শুরুতে ভারতীয় রেলওয়ের টিকিট পরীক্ষক হিসেবে কর্মরত রঙ্গনাথ ১৯৬৯ সালে বাপু পরিচালিত ‘বুদ্ধিমানথুডু’ সিনেমার মাধ্যমে প্রথমবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ান। এরপর প্রায় ৪৬ বছর ধরে ৩০০টিরও বেশি চলচ্চিত্র এবং অসংখ্য টেলিভিশন ধারাবাহিকে অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান। নায়ক হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও পরবর্তী সময়ে খলনায়ক ও চরিত্রাভিনেতা হিসেবে তাঁর সাবলীল উপস্থিতি দর্শকদের বিমোহিত করেছিল। ‘জমিন্দারুগারি আম্মাই’, ‘আমেরিকা আম্মাই’, ‘মনমাধুডু’ কিংবা ‘নিজাম’-এর মতো ক্ল্যাসিক সিনেমাগুলোতে তাঁর অনবদ্য অভিনয় আজও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের স্মৃতির মণিকোঠায় উজ্জ্বল।
ব্যক্তিজীবনে চরম সাফল্যের শিখরে পৌঁছালেও রঙ্গনাথের জীবন ছিল একাকীত্বের দীর্ঘ লড়াইয়ে ভরা। বিশেষ করে ২০০৯ সালে জীবনসঙ্গিনীকে হারানোর পর তিনি তীব্র বিষণ্নতায় নিমজ্জিত হন। তাঁর কন্যা নীরজা পরবর্তীতে জানিয়েছিলেন, একাকীত্ব ও বিষণ্নতার চরম পর্যায়ে থাকা বাবা মাঝেমধ্যেই আত্মহত্যার কথা বলতেন এবং নিয়মিত কাউন্সেলিং নিলেও শেষ রক্ষা হয়নি।
মৃত্যুর সেই বিষাদময় সন্ধ্যায় যখন ঘরের দরজা ভেঙে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়, তখন দেয়ালে কালো মার্কার দিয়ে লেখা একটি ছোট চিরকুট সবার নজর কাড়ে। সেখানে লেখা ছিল, ‘এটা তাকে দিয়ে দিও, তাকে কষ্ট দিও না।’ অভিনেতা তাঁর সারাজীবনের অর্জিত সঞ্চয় নিজের পরিবারের সদস্যদের বদলে তুলে দিয়েছিলেন দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত গৃহকর্মী মীনাক্ষীর হাতে। রঙ্গনাথের তিন সন্তান—দুই মেয়ে ও এক ছেলে—বাবার অকাল প্রয়াণে শোকস্তব্ধ হলেও তাঁর শেষ ইচ্ছাকে পরম সম্মানের সঙ্গে গ্রহণ করেছিলেন।
শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা বাবার রেখে যাওয়া সমস্ত সঞ্চয় মীনাক্ষীর হাতে তুলে দেন। একজন খ্যাতনামা শিল্পীর জীবনের শেষপ্রান্তে এসে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত একদিকে যেমন তাঁর নিঃসঙ্গ জীবনের করুণ প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে তেমনি মানবিকতার এক বিরল দৃষ্টান্ত। রঙিন দুনিয়ার ঝকমকে পর্দার আড়ালে থাকা এক নিঃসঙ্গ মানুষের এই শেষ বার্তা আজও বিনোদন দুনিয়ার মানুষকে আবেগপ্রবণ করে তোলে।
