মানুষ মূলত সামাজিক জীব। জন্মের পর থেকেই মানুষ পরিবার, গোষ্ঠী, প্রতিষ্ঠান ও বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে জীবনযাপন করে। সমাজে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সামাজিক প্রতিষ্ঠান, সামাজিক আচরণ, পরিবর্তন, সংঘাত ও সংহতি ইত্যাদি বিষয়কে বৈজ্ঞানিকভাবে অধ্যয়ন করার প্রয়োজন থেকেই সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভব। সমাজবিজ্ঞান একটি তুলনামূলকভাবে নবীন সামাজিক বিজ্ঞান হলেও এর আলোচ্য বিষয়—মানুষ ও সমাজ—অত্যন্ত প্রাচীন। প্রাচীনকাল থেকেই দার্শনিকরা সমাজ ও রাষ্ট্র সম্পর্কে চিন্তা করেছেন। তবে একটি স্বতন্ত্র ও বৈজ্ঞানিক শাস্ত্র হিসেবে সমাজবিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠা ঘটে মূলত উনবিংশ শতাব্দীতে।
সমাজবিজ্ঞানের অর্থ ও সংজ্ঞা:
‘সমাজবিজ্ঞান’ শব্দটি ইংরেজি Sociology-এর বাংলা প্রতিশব্দ। Sociology শব্দটি দুটি শব্দ থেকে গঠিত—ল্যাটিন Socius, যার অর্থ সমাজ বা সঙ্গী এবং গ্রিক Logos, যার অর্থ জ্ঞান, বিজ্ঞান বা আলোচনা। অর্থাৎ Sociology-এর আক্ষরিক অর্থ হলো সমাজ সম্পর্কিত বিজ্ঞান বা সমাজের বৈজ্ঞানিক অধ্যয়ন।
ফরাসি দার্শনিক অগাস্ট কোঁৎ (Auguste Comte) ১৮৩৮ সালে প্রথম ‘Sociology’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এজন্য তাঁকে সমাজবিজ্ঞানের জনক বলা হয়।
সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার সমাজবিজ্ঞানকে সামাজিক কার্যক্রমের ব্যাখ্যামূলক অনুধাবন এবং তার ফলে ও গতিপথের কার্যকারণগত ব্যাখ্যার বিজ্ঞান হিসেবে দেখেছেন। অন্যদিকে মরিস গিন্সবার্গ সমাজবিজ্ঞানকে মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ও আন্তঃক্রিয়া থেকে উদ্ভূত সামাজিক সম্পর্কের অধ্যয়ন হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন।
সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তির পটভূমি:
সমাজবিজ্ঞান হঠাৎ করে সৃষ্টি হয়নি। দীর্ঘ সময় ধরে সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এর জন্ম হয়েছে। এর প্রধান পটভূমিগুলো হলো—
১. প্রাচীন গ্রিসের দার্শনিক চিন্তা
সমাজবিজ্ঞানের প্রত্যক্ষ জন্ম উনবিংশ শতাব্দীতে হলেও এর চিন্তাগত ভিত্তি অনেক পুরোনো। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক প্লেটো ও এরিস্টটল সমাজ, রাষ্ট্র, পরিবার, শাসনব্যবস্থা, সামাজিক শ্রেণি ও নাগরিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন।
প্লেটোর The Republic গ্রন্থে আদর্শ রাষ্ট্র ও সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের আলোচনা পাওয়া যায়। এরিস্টটল তাঁর Politics গ্রন্থে রাষ্ট্র, পরিবার ও সামাজিক সংগঠন নিয়ে আলোচনা করেন। এসব চিন্তা পরবর্তীকালে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২. রেনেসাঁ বা নবজাগরণ
চতুর্দশ থেকে ষোড়শ শতাব্দীতে ইউরোপে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের ফলে মানুষের চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে। ধর্মীয় কর্তৃত্বের পাশাপাশি মানুষ যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও বাস্তব জ্ঞানকে গুরুত্ব দিতে শুরু করে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে নতুনভাবে বোঝার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
৩. বৈজ্ঞানিক বিপ্লব
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যাপক উন্নতি ঘটে। কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন প্রমুখ বিজ্ঞানীর গবেষণা মানুষকে প্রকৃতি ও সমাজকে যুক্তি ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করার দিকে উৎসাহিত করে। এর ফলে সামাজিক ঘটনাবলিকেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে অধ্যয়ন করার ধারণা শক্তিশালী হয়।
৪. আলোকায়ন আন্দোলন
অষ্টাদশ শতাব্দীর আলোকায়ন আন্দোলন সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তিতে বিশেষ ভূমিকা রাখে। জন লক, জ্যঁ জাক রুশো, মন্টেস্কু, ভলতেয়ার প্রমুখ চিন্তাবিদ যুক্তি, স্বাধীনতা, সাম্য, মানবাধিকার ও সামাজিক চুক্তির ধারণা প্রচার করেন।
রুশোর The Social Contract এবং মন্টেস্কুর The Spirit of Laws সমাজ ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের প্রকৃতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
৫. ফরাসি বিপ্লব
১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব ইউরোপের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনে। সাম্য, স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্বের আদর্শ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পুরোনো সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রশ্নের মুখে পড়ে।
বিপ্লব-পরবর্তী সামাজিক অস্থিরতা ও পরিবর্তন সমাজকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার প্রয়োজনীয়তা বাড়িয়ে দেয়। অগাস্ট কোঁৎ সমাজে শৃঙ্খলা ও পরিবর্তনের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেন।
৬. শিল্পবিপ্লব
সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তির অন্যতম প্রধান কারণ হলো শিল্পবিপ্লব। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগ থেকে ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের ফলে কৃষিভিত্তিক সমাজ দ্রুত শিল্প ও নগরভিত্তিক সমাজে রূপান্তরিত হয়।
কারখানা ব্যবস্থা, নগরায়ণ, শ্রমিক শ্রেণির সৃষ্টি, পুঁজিপতি ও শ্রমিকের মধ্যে বৈষম্য, বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং শ্রমিক অসন্তোষের মতো নতুন সামাজিক সমস্যা দেখা দেয়। এসব পরিবর্তন বিশ্লেষণের প্রয়োজন সমাজবিজ্ঞানের বিকাশকে ত্বরান্বিত করে।
৭. নগরায়ণ ও জনসংখ্যার পরিবর্তন
শিল্পবিপ্লবের ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে আসতে শুরু করে। দ্রুত নগরায়ণের ফলে পরিবার, প্রতিবেশ, পেশা, শ্রেণি সম্পর্ক ও সামাজিক মূল্যবোধে পরিবর্তন আসে। এসব নতুন সামাজিক বাস্তবতা সমাজবিজ্ঞানীদের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
৮. পুঁজিবাদের বিকাশ
শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে ইউরোপে আধুনিক পুঁজিবাদ দ্রুত বিকশিত হয়। উৎপাদনের উপকরণের মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে পার্থক্য বৃদ্ধি পায়। সম্পদের অসম বণ্টন, শ্রেণিসংঘাত ও শ্রমিক শোষণ নিয়ে নতুন প্রশ্ন সৃষ্টি হয়। কার্ল মার্কস এসব বিষয় বিশ্লেষণ করে শ্রেণিসংঘাত ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের তত্ত্ব বিকাশ করেন।
সমাজবিজ্ঞানের ক্রমবিকাশ:
সমাজবিজ্ঞানের বিকাশকে কয়েকটি পর্যায়ে আলোচনা করা যায়।
প্রথম পর্যায়: সমাজবিজ্ঞানের পূর্ববর্তী চিন্তাধারা:
সমাজবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক জন্মের বহু আগে থেকেই সমাজ সম্পর্কে চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল।
প্লেটো সমাজ ও রাষ্ট্রের কাঠামো সম্পর্কে আলোচনা করেন।
এরিস্টটল মানুষকে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীব হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
পরবর্তীকালে ইবনে খালদুন সমাজের পরিবর্তন, গোষ্ঠী সংহতি, রাষ্ট্রের উত্থান-পতন এবং সভ্যতার বিকাশ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করেন।
ইবনে খালদুনের Muqaddimah সমাজ বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনেক গবেষক তাঁকে আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম অগ্রদূত হিসেবে বিবেচনা করেন।
দ্বিতীয় পর্যায়: অগাস্ট কোঁৎ ও সমাজবিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক জন্ম:
অগাস্ট কোঁৎ (১৭৯৮–১৮৫৭) সমাজবিজ্ঞানকে একটি স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রথমে সমাজবিজ্ঞানের জন্য ‘Social Physics’ শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন এবং পরে ১৮৩৮ সালে ‘Sociology’ শব্দটি প্রবর্তন করেন।
কোঁৎ মনে করতেন, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতো সমাজকেও পর্যবেক্ষণ, তুলনা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির মাধ্যমে অধ্যয়ন করা সম্ভব। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিকে Positivism বা প্রত্যক্ষবাদ বলা হয়।
কোঁতের তিন স্তরের সূত্র
কোঁতের মতে মানুষের চিন্তা ও সমাজের বিকাশ তিনটি পর্যায়ের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয়—
- ধর্মতাত্ত্বিক বা কাল্পনিক পর্যায়
- অধিবিদ্যাগত বা বিমূর্ত পর্যায়
- দৃষ্টবাদী বা বৈজ্ঞানিক পর্যায়
এই তত্ত্ব সমাজবিজ্ঞানের প্রাথমিক বিকাশে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তৃতীয় পর্যায়: হার্বার্ট স্পেন্সার:
হার্বার্ট স্পেন্সার (১৮২০–১৯০৩) সমাজবিজ্ঞানের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তিনি সমাজকে একটি জীবদেহের সঙ্গে তুলনা করেন। তাঁর মতে, জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ যেমন পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল, তেমনি সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।
স্পেন্সার সামাজিক বিবর্তন বা Social Evolution-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর লেখার মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞান ইংল্যান্ড ও অন্যান্য দেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে।
চতুর্থ পর্যায়: কার্ল মার্কস:
কার্ল মার্কস (১৮১৮–১৮৮৩) সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম প্রভাবশালী চিন্তাবিদ। তিনি সমাজের অর্থনৈতিক কাঠামো, শ্রেণিবিভাগ ও শ্রেণিসংঘাত বিশ্লেষণ করেন।
মার্কসের মতে, ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে উৎপাদনব্যবস্থা সমাজের কাঠামোকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তিনি শ্রেণিসংঘাতের তত্ত্ব, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ এবং পুঁজিবাদী সমাজের বিশ্লেষণের মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
পঞ্চম পর্যায়: এমিল দুর্খেইম:
এমিল দুর্খেইম (১৮৫৮–১৯১৭) সমাজবিজ্ঞানকে একটি স্বতন্ত্র একাডেমিক শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন।
তিনি Social Facts বা সামাজিক ঘটনা ধারণাটি বিকাশ করেন। তাঁর মতে, সামাজিক ঘটনা ব্যক্তির বাইরে বিদ্যমান এবং ব্যক্তির আচরণকে প্রভাবিত করতে পারে।
দুর্খেইম আত্মহত্যা নিয়ে গবেষণা করে দেখান যে ব্যক্তিগত বলে মনে হওয়া ঘটনাও সামাজিক কারণ দ্বারা প্রভাবিত হতে পারে। তাঁর The Division of Labour in Society, Suicide এবং The Elementary Forms of Religious Life সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
তিনি সামাজিক সংহতিকে প্রধানত দুই ভাগে ব্যাখ্যা করেন—
যান্ত্রিক সংহতি
জৈবিক সংহতি
ষষ্ঠ পর্যায়: ম্যাক্স ওয়েবার:
ম্যাক্স ওয়েবার (১৮৬৪–১৯২০) সমাজবিজ্ঞানের ব্যাখ্যামূলক ধারার অন্যতম প্রধান প্রবক্তা।
ওয়েবার মানুষের সামাজিক আচরণের অর্থ ও উদ্দেশ্য বোঝার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর পদ্ধতিকে Verstehen বা ব্যাখ্যামূলক অনুধাবন বলা হয়।
তিনি Social Action বা সামাজিক কার্যক্রম, Ideal Type বা আদর্শ ধরন, আমলাতন্ত্র, কর্তৃত্বের ধরন এবং ধর্ম ও অর্থনীতির সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন।
তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ The Protestant Ethic and the Spirit of Capitalism আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
বিংশ শতাব্দীতে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ:
বিংশ শতাব্দীতে সমাজবিজ্ঞান ইউরোপের বাইরে বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে দ্রুত বিকশিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সমাজবিজ্ঞান স্বতন্ত্র বিভাগ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।
১. শিকাগো স্কুল
যুক্তরাষ্ট্রের University of Chicago-কে কেন্দ্র করে সমাজবিজ্ঞানের একটি শক্তিশালী গবেষণা ধারা গড়ে ওঠে। নগরজীবন, অভিবাসন, অপরাধ, সামাজিক বিচ্যুতি ও নগর সম্প্রদায় নিয়ে গবেষণা হয়।
২. প্রতীকী আন্তঃক্রিয়াবাদ
জর্জ হার্বার্ট মিড, হার্বার্ট ব্লুমার প্রমুখের চিন্তার মাধ্যমে Symbolic Interactionism বা প্রতীকী আন্তঃক্রিয়াবাদ বিকশিত হয়।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে মানুষের দৈনন্দিন পারস্পরিক সম্পর্ক, ভাষা, প্রতীক ও অর্থ কীভাবে সামাজিক বাস্তবতা তৈরি করে—তা বিশ্লেষণ করা হয়।
৩. কাঠামোগত কার্যকরীতাবাদ
ট্যালকট পারসন্স ও রবার্ট কে. মার্টনের মতো সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কীভাবে সমাজের স্থিতিশীলতা ও কার্যক্রম বজায় রাখে তা বিশ্লেষণ করেন।
৪. সংঘাত তত্ত্ব
মার্কসের চিন্তার প্রভাব থেকে পরবর্তীকালে বিভিন্ন সংঘাতভিত্তিক সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্বের বিকাশ ঘটে। ক্ষমতা, সম্পদ, শ্রেণি, বৈষম্য ও সামাজিক আধিপত্য এসব গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
৫. নারীবাদী সমাজবিজ্ঞান
পরবর্তীকালে নারীবাদী সমাজবিজ্ঞান পরিবার, কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, রাজনীতি, ক্ষমতা, লিঙ্গবৈষম্য এবং নারীর সামাজিক অবস্থান নিয়ে গবেষণাকে গুরুত্ব দেয়।
সমকালীন সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ:
বর্তমান সময়ে সমাজবিজ্ঞানের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়েছে। আধুনিক সমাজবিজ্ঞান শুধু পরিবার, রাষ্ট্র বা শ্রেণি নিয়ে আলোচনা করে না; বরং প্রযুক্তি, গণমাধ্যম, ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশ্বায়ন, অভিবাসন, পরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, অপরাধ, সংস্কৃতি, নগরায়ণ ও বৈষম্যের মতো বিষয়ও বিশ্লেষণ করে।
বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
পরিবার ও বিবাহের সমাজবিজ্ঞান
শিক্ষা সমাজবিজ্ঞান
অর্থনৈতিক সমাজবিজ্ঞান
রাজনৈতিক সমাজবিজ্ঞান
ধর্মের সমাজবিজ্ঞান
শিল্প সমাজবিজ্ঞান
নগর সমাজবিজ্ঞান
গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান
অপরাধ ও বিচ্যুতির সমাজবিজ্ঞান
চিকিৎসা সমাজবিজ্ঞান
গণমাধ্যমের সমাজবিজ্ঞান
পরিবেশ সমাজবিজ্ঞান
লিঙ্গ ও নারীবাদী সমাজবিজ্ঞান
উন্নয়ন সমাজবিজ্ঞান
বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ:
বাংলাদেশে সমাজবিজ্ঞানের বিকাশ মূলত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সমাজবিজ্ঞানকে একাডেমিক বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শুরু হয়। স্বাধীনতার পর সমাজের দারিদ্র্য, গ্রামীণ সমাজ, কৃষি, পরিবার, জনসংখ্যা, নগরায়ণ, উন্নয়ন, সামাজিক বৈষম্য, নারী ও শিশুর অবস্থা এবং সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা বাড়তে থাকে।
বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানীরা বিশেষভাবে গ্রামীণ সমাজ, কৃষকসমাজ, পরিবার ও আত্মীয়তা, দারিদ্র্য, উন্নয়ন, নগরায়ণ, সামাজিক স্তরবিন্যাস, রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অভিবাসন এবং সামাজিক পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেছেন।
বাংলাদেশের দ্রুত নগরায়ণ, পোশাকশিল্পের বিকাশ, বিদেশে শ্রম অভিবাসন, প্রযুক্তির বিস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো বিষয়ও বর্তমানে সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাক্ষেত্র।
সমাজবিজ্ঞানের গুরুত্ব:
সমাজবিজ্ঞান সমাজকে বৈজ্ঞানিকভাবে বুঝতে সাহায্য করে। এর মাধ্যমে—
১. সামাজিক সমস্যা ও তার কারণ শনাক্ত করা যায়।
২. সামাজিক পরিবর্তনের প্রকৃতি বোঝা যায়।
৩. সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বিশ্লেষণ করা যায়।
৪. সামাজিক বৈষম্য ও স্তরবিন্যাস সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
৫. উন্নয়ন পরিকল্পনা ও নীতি প্রণয়নে তথ্য ও বিশ্লেষণ দেওয়া যায়।
৬. অপরাধ, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক বিচ্যুতির কারণ বিশ্লেষণ করা যায়।
৭. ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝা যায়।
৮. পরিবর্তনশীল সমাজে মানুষের আচরণ ও সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা যায়।
উপসংহার:
সমাজবিজ্ঞানের উৎপত্তি কোনো একক ঘটনা বা ব্যক্তির চিন্তার ফল নয়; বরং দীর্ঘদিনের দার্শনিক চিন্তা, বৈজ্ঞানিক বিপ্লব, আলোকায়ন, ফরাসি বিপ্লব, শিল্পবিপ্লব, নগরায়ণ ও পুঁজিবাদের বিকাশের সম্মিলিত ফল। অগাস্ট কোঁৎ উনবিংশ শতাব্দীতে সমাজবিজ্ঞানকে স্বতন্ত্র বিজ্ঞান হিসেবে প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করেন। পরবর্তীকালে হার্বার্ট স্পেন্সার, কার্ল মার্কস, এমিল দুর্খেইম ও ম্যাক্স ওয়েবারের মতো চিন্তাবিদদের অবদানে সমাজবিজ্ঞান একটি সুসংগঠিত একাডেমিক শাস্ত্রে পরিণত হয়।
বর্তমানে সমাজবিজ্ঞান একটি বহুমাত্রিক ও পরিবর্তনশীল সামাজিক বিজ্ঞান। সমাজের পরিবর্তন, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই বলা যায়, সমাজবিজ্ঞানের ইতিহাস মূলত মানুষের সমাজকে কুসংস্কার ও অনুমানের পরিবর্তে যুক্তি, পর্যবেক্ষণ ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে বোঝার দীর্ঘ যাত্রার ইতিহাস।