সঙ্গে মোবাইল না রেখেও যেভাবে ধরা পড়লেন ঘাতক অটোরিকশাচালক

কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রাম থেকে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৪) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্যাদি গণমাধ্যমের সামনে তুলে ধরে পুলিশ প্রশাসন। এর আগে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) চট্টগ্রাম নগরের অলংকার এলাকা থেকে মামলার একমাত্র আসামি ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিজের কাছে কোনো মোবাইল ফোন বা ডিজিটাল ডিভাইস না থাকা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত পুলিশের জালে ধরা পড়েন এই ঘাতক।

পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে এসেছে রোমহর্ষক তথ্য। ৪ অক্টোবর সকালে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বাসা থেকে বের হয় তাজমিন। ৭ অক্টোবর রাতে তাকে শেষবার কুমিল্লার হোটেল নূরজাহানের সামনে দেখা যায় এবং গভীর রাতে সে বাবাকে হোয়াটসঅ্যাপে লাইভ লোকেশন পাঠিয়ে উদ্ধারের আকুতি জানায়। কিন্তু বাবা ঘুমিয়ে থাকায় সেই বার্তা দেখতে পাননি। পরদিন বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত তাজমিন যশোর সদর উপজেলার ছাতিয়াতলা গ্রামের আব্দুল আলিমের মেয়ে এবং সে কুমিল্লা নগরের ফরিদা বিদ্যায়তনের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। তার বাবা কুমিল্লা শহরের রেসকোর্স এলাকায় ভাড়া বাসায় থেকে একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করেন।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন গ্রেপ্তারকৃত অটোরিকশাচালক সুমন। তিনি জানান, ৩০০ টাকা ভাড়ার চুক্তিতে পদুয়ার বাজার থেকে রেসকোর্স এলাকায় নেওয়ার নাম করে শর্টকাট পথে যাত্রা শুরু করেন তিনি। কিন্তু হোটেল নূরজাহানের পাশ দিয়ে কৌশলে চাঁদপুর সড়কের দিকে অটোরিকশাটি নিয়ে যান। পথে তাজমিন তাকে কলা ও পাউরুটি কিনে দেওয়ার জন্য ১০০ টাকা দিলে তিনি খাবার কিনে গাড়িটি লাকসাম উপজেলার বিজরা এলাকা হয়ে লালমাই-বাগমারার জগতপুর এলাকার একটি নির্জন সড়কে নিয়ে যান। সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের চেষ্টা করলে উভয়ের মধ্যে ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে ধানখেতে গাড়ি কাত হয়ে গেলে তাজমিন পালানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। পরে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ শেষে গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন সুমন। মৃত্যু নিশ্চিত করতে তার মাথার ওপর পা দিয়ে চেপে ধরে রাখা হয়েছিল বলেও জানায় পুলিশ।

হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থলে সিএনজিচালিত অটোরিকশাটি ফেলে রেখে তাজমিনের ভ্যানিটি ব্যাগে থাকা আইফোনটি নিয়ে পালিয়ে যান সুমন। যাওয়ার আগে পাশের একটি মসজিদের পুকুরে গোসল সেরে বারপাড়া এলাকার একটি পুকুরপাড়ে ফোনটি লুকিয়ে রেখে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওয়ানা দেন। সুমনের কাছে কোনো ডিজিটাল ডিভাইস না থাকায় তার অবস্থান নিশ্চিত করতে কিছুটা বেগ পেতে হয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে। পরবর্তীতে সুমনের শ্বশুরবাড়ির আত্মীয়-স্বজনের মোবাইল নম্বরের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়। বৃহস্পতিবার (৯ অক্টোবর) রাতে সুমনের এক ভাই চট্টগ্রামে থাকেন বলে তথ্য পায় পুলিশ। এরপর শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চট্টগ্রাম নগরের অলংকার এলাকার এক ব্যক্তির ফোন ব্যবহার করে লালমাইয়ের জগতপুর এলাকার এক আত্মীয়ের কাছে বিকাশে ৫০০ টাকা পাঠানোর অনুরোধ জানিয়ে কল করেন সুমন। এই একটিমাত্র ফোনকলের সূত্র ধরে নিখুঁত প্রযুক্তির সহায়তায় তার অবস্থান শনাক্ত করে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সুমন এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) পঙ্কজ বড়ুয়া। নিহত শিক্ষার্থীর বাবা আব্দুল আলিম বাদী হয়ে লালমাই থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। এদিকে এই পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত একমাত্র আসামির দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নিহত তাজমিনের পরিবারসহ স্থানীয় এলাকাবাসী। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃত আসামিকে আদালতে সোপর্দ করে রিমান্ড আবেদন করা হবে এবং তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

০%
০%
০%
০%