বগুড়ার সদর উপজেলায় ঝালাই মেশিন চুরির মিথ্যা অপবাদ দিয়ে রিপন মুরমু (২৭) নামের এক সাঁওতাল যুবককে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) দুপুরে উপজেলার লাহিড়ীপাড়া ইউনিয়নের চানপাড়া এলাকার ডিউকের ইটভাটার একটি পরিত্যক্ত ঘর থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত রিপন মুরমু দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার বেলোয়া বামুনপাড়ার মোসেস মুরমুর ছেলে। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে ওই ইটভাটায় শ্রমিকের কাজ করার পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী রেজাউল করিমের ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপে নৈশপ্রহরীর দায়িত্ব পালন করছিলেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতে রেজাউল করিমের ওয়েল্ডিং ওয়ার্কশপ থেকে একটি ঝালাই মেশিন চুরির ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার জেরে শুক্রবার রিপনকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সালিশ বৈঠক করেন মেশিনের মালিক রেজাউল করিম ও স্থানীয় এক সাবেক ইউপি চেয়ারম্যানের ছেলে সেলিম। সালিশ চলাকালে তাকে বেদম মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন স্বজনরা। একপর্যায়ে কালু নামের অন্য এক ব্যক্তিকে চুরির সঙ্গে জড়িত চিহ্নিত করে সেই ব্যক্তি ও চুরি যাওয়া মেশিন উদ্ধারের পুরো দায়িত্ব রিপনের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে তাকে ২০ হাজার টাকা জরিমানার নামে চরম মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। স্বজনদের দাবি, এই পাশবিক মারধরের ফলেই রিপন গুরুতর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
পরিস্থিতি বেগতিক বুঝে এবং নিজেদের দায় এড়াতে রেজাউল ও সেলিম মিলে শুক্রবার রাতে একটি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে রিপনের মরদেহ তার গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। কিন্তু নিহতের পরিবার ও স্থানীয়রা মরদেহের গায়ে আঘাতের চিহ্ন দেখে তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। অ্যাম্বুলেন্সচালক সিয়াম জানান, সেলিম নামের এক ব্যক্তির ফোন পেয়ে শুক্রবার রাত ৯টার দিকে তিনি চানপাড়া ইটভাটা এলাকায় যান। প্রথমে তাকে একজন অসুস্থ রোগীকে বহনের কথা বলা হলেও পরবর্তীতে মরদেহ পরিবহনের নির্দেশ দেওয়া হয়। ঘোড়াঘাটে পৌঁছানোর পর স্থানীয়দের বাধার মুখে পড়ে সারারাত কাটিয়ে শনিবার ভোরে তিনি মরদেহটি নিয়ে পুনরায় বগুড়ার ইটভাটার সামনে ফিরে আসেন।
ঘোড়াঘাট উপজেলার পালশা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য রবিউল ইসলাম জানান, রাতে রিপনের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর খবর পেয়ে তিনি সেখানে যান এবং কর্মস্থলের লোকজনের সঙ্গে কথা বলে বক্তব্যে অসঙ্গতি পান। পরবর্তীতে পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি শনিবার বেলা ১১টার দিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। নিহত যুবকের বাবা মোসেস মুরমু শোকে বিহ্বল হয়ে বলেন, তিনি এসে ছেলের চোখ, হাত ও কোমরে ভয়াবহ আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছেন। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হওয়ার পর তারা এ ঘটনায় হত্যা মামলা দায়ের করবেন।
বগুড়া সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইব্রাহিম আলী জানান, ঝালাই মেশিন চুরির সালিশে স্থানীয় লোকজনের মারধরের শিকার হয়ে রাতে ওই যুবকের মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। মরদেহ উদ্ধার করে সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুতপূর্বক ময়নাতদন্তের জন্য বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন সম্ভব হবে। এ ঘটনায় এখনো কাউকে আটক করা না হলেও লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেছেন। এদিকে, এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয় সাঁওতাল সম্প্রদায় ও নিহত যুবকের পরিবার দোষীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।