বাবাকে হারিয়ে ও জটিল রোগ জয় করে আইনবিদের মুকুট গার্গীর মাথায়

মেধাবী এক তরুণীর প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন বাবার আকস্মিক মৃত্যু, তীব্র আর্থিক সংকট এবং একপর্যায়ে জটিল শারীরিক অসুস্থতার কারণে থমকে গেলেও জীবনযুদ্ধের হার না মানা এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন পিরোজপুরের গার্গী চ্যাটার্জী। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় উজ্জ্বল গার্গী ২০১৭ সালের ১৬ মার্চ হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে বাবা দীপক কুমার চ্যাটার্জীকে হারানোর পর থেকেই নানামুখী প্রতিকূলতার মুখোমুখি হন। স্ট্যাম্প ভেন্ডার ও শিক্ষানবিশ আইনজীবী বাবার মৃত্যুর পর সংসারের হাল ধরতে এবং তার পড়াশোনা টিকিয়ে রাখতে মা পূর্ণিমা চ্যাটার্জী স্বরূপকাঠীর পৈতৃক জমিও একপর্যায়ে বিক্রি করে দেন।

অর্থকষ্টের তীব্রতায় ঢাকায় মাইলস্টোন ও রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের পাট চুকিয়ে পিরোজপুরে ফিরে আসতে বাধ্য হন গার্গী। পরবর্তীতে ২০১৮ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৪.১৭ অর্জন করলেও ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার শৈশবকালীন স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসে। তবে বাবা-মায়ের আরেকটি স্বপ্ন ছিল মেয়েকে নিজের পায়ে দাঁড় করানোর; সেই জেদ থেকেই ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি। পড়াশোনার খরচের জোগান দিতে টিউশনি, কোচিংয়ে পড়ানো এবং ২০২০-২১ সালের দিকে নিজ উদ্যোগে হোমমেড জুয়েলারির ব্যবসা শুরু করে স্বাবলম্বী হওয়ার লড়াই চালিয়ে যান এই অদম্য তরুণী।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে আইন বিভাগের শেষ বর্ষে থাকতেই তার শরীরে বাসা বাঁধে জটিল রোগ ‘অ্যাঙ্কাইলোজিং স্পন্ডিলাইটিস’। ধীরে ধীরে সারা শরীরে তীব্র ব্যথা, হাত-পা নাড়াতে সমস্যা এবং ঘাড় সোজা রাখতে না পারার কারণে বন্ধ হয়ে যায় তার ব্যবসাটি। শারীরিক এই চরম বিপর্যয়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে অসুস্থতার সঙ্গে অবিরাম লড়াই চালিয়ে যান গার্গী; এলএলবিতে ৩.৮৬ এবং এলএলএমে ৩.৮৮ সিজিপিএ অর্জন করে সফলতার স্বাক্ষর রাখেন। এরপর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসে (বিইউপি) মাস্টার্স অব পিস, কনফ্লিক্ট অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস স্টাডিজে ভর্তি হন, যেখানে শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটলে বন্ধু নিজাম, শ্রীবতি ও রনকের সহযোগিতায় হুইলচেয়ারে করেই ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতে হতো তাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশ মেডিকেল ইউনিভার্সিটির রিউমাটোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. আবু শাহীনের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন গার্গীর স্যাক্রোইলিয়াক জয়েন্ট, হিপ জয়েন্ট ও লাম্বার স্পাইনের বিভিন্ন অংশ জোড়া লেগে গেছে এবং সামান্য চলাফেরার জন্যও তাকে লাঠি কিংবা হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভর করতে হয়। দীর্ঘদিন অ্যাডালিমুম্যাব ও ইটানারসেপ্টের মতো ব্যয়বহুল ইনজেকশন নেওয়ার পর চিকিৎসকদের পরামর্শে এখন তার হিপ জয়েন্ট প্রতিস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। এছাড়া প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে ‘গোলিমুম্যাব’ ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও নতুন এই চিকিৎসা শুরুর আগে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও টিকার প্রয়োজন রয়েছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

জীবনের এই বন্ধুর পথে গার্গীর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছেন তার দীর্ঘদিনের বন্ধু ও জীবনসঙ্গী নিলয় ভৌমিক। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পড়াশোনা শেষ করে বিদেশের মাটিতে পিএইচডি করার পরিকল্পনা থাকলেও গার্গীর অসুস্থতার কথা চিন্তা করে সেই স্বপ্ন বিসর্জন দেন নিলয়। দীর্ঘ সাত বছরের সম্পর্কের পর ২০২৪ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। বর্তমানে স্ত্রীর মাসিক ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার চিকিৎসা খরচ মেটাতে গিয়ে বিভিন্ন খণ্ডকালীন কাজের পাশাপাশি চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসারের চাকরি নেন নিলয়, তবুও পাহাড়সম দেনা ও চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করা তার জন্য অত্যন্ত দুরূহ হয়ে পড়েছে।

প্রিয় মানুষের এই নির্বাক যুদ্ধ নিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে নিলয় ভৌমিক জানান, সারাক্ষণ ব্যথার সঙ্গে লড়াই করে হাসিমুখে থাকা মানুষটির ব্যথায় যখন অংশীদার হতে পারেন না, তখন নিজেকে বড় অসহায় লাগে; তবে এই অদম্য লড়াই তাকেও এক অদৃশ্য আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক শক্তি জোগায়। এদিকে গার্গীর উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ের অ্যাপোলো হাসপাতালের বিখ্যাত চিকিৎসক ডা. মদন মোহন রেড্ডির অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিশ্চিত করা হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নিবন্ধন সম্পন্ন করে দ্রুতই তাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে পরিবার।

০%
০%
০%
০%