ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের সময় আতঙ্কে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে পদদলিত হয়ে এক শিশুসহ ছয়জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এই দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ২০ জন। ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অর্থ ও প্রশাসন) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন এই হতাহতের ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ছয়টার দিকে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় শিশু ওয়ার্ডে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। হঠাৎ আগুন লাগার খবর ছড়িয়ে পড়লে রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক দেখা দেয়। দ্রুত ভবন ছেড়ে নিচে নামার সময় সিঁড়িতে হুড়োহুড়ি শুরু হয় এবং পদদলিত হয়ে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
নিহতদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলেন নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার বসী গ্রামের হাজেরা বেগম, ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া গ্রামের শাহজাহান, একই উপজেলার রমজান ও জাহানারা এবং তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের কুলসুমা। এ ছাড়া নিহত অপর এক অজ্ঞাতপরিচয় শিশুর পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলছে।
খবর পেয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ফায়ার স্টেশনের একটি ইউনিট এবং পরে সদর ফায়ার সার্ভিসের অন্যান্য ইউনিটসহ মোট চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মী, হাসপাতালের নিরাপত্তাকর্মী, স্টাফ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও পুরো ভবনে তীব্র ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করেন।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মোহাম্মদ মাঈন উদ্দিন খান জানান, প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী লিফটের মেশিন থেকে এই আগুনের সূত্রপাত হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন যে, হাসপাতালে ভর্তি কোনো রোগী আগুনে পুড়ে বা পদদলিত হয়ে মারা যাননি।
এই অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের নতুন ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, নতুন ভবনে একাধিক সিঁড়ি থাকলেও তার মধ্যে চারটি সিঁড়ি নিয়মিত তালাবদ্ধ রাখা হতো এবং চলাচলের জন্য কেবল একটি সিঁড়ি উন্মুক্ত রাখা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় আতঙ্কিত মানুষ একটিমাত্র সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার চেষ্টা করায় এই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এর আগে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানানো হলেও সিঁড়িগুলো সবসময় খোলা রাখার কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের অন্যতম প্রধান এই চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সমাগম করেন। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে তিন থেকে চার হাজার রোগী ভর্তি থাকেন এবং চার থেকে পাঁচ হাজার রোগী বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেন। রোগীর সঙ্গে স্বজনদের মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার মানুষের সমাগম ঘটে এই হাসপাতালে। অথচ এত বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য লিফট ও জরুরি বহির্গমন ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, চারতলা পুরোনো ভবন ও নয়তলা নতুন ভবন মিলিয়ে পুরো ক্যাম্পাসে মোট ২১টি লিফট রয়েছে, যার মধ্যে হাসপাতালের দুটি ভবনে রয়েছে ১৫টি লিফট। গণপূর্ত অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী ১৫টি লিফটের মধ্যে ১২টি সচল এবং তিনটি অচল। তবে সরেজমিন পরিদর্শনে ভিন্ন চিত্র পাওয়া গেছে। নতুন ভবনের নিচতলায় পাশাপাশি থাকা পাঁচটি লিফটের মধ্যে চারটিই বন্ধ থাকতে দেখা যায়। সচল একটি লিফটের সামনে ট্রলিতে থাকা মুমূর্ষু রোগী ও শিশুদের নিয়ে শত শত মানুষকে দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা যায়।
হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনরা জানান, লিফট দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকায় এবং রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের কারণে তাদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গণপূর্ত অধিদপ্তরের ময়মনসিংহ অফিসের আওতাধীন লিফট রক্ষণাবেক্ষণের কাজ ২০০৭ সাল থেকে ‘নাঈমা এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে আসছে। লিফট পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত অপারেটর ও সরকারি বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে তার ব্যাপক গরমিল রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অপারেটরদের নামে বরাদ্দ করা অর্থের বড় অংশ আত্মসাৎ করা হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এ ছাড়া লিফটের আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অটোমেটিক রেসকিউ ডিভাইসের ত্রুটির কারণে মাঝেমধ্যেই যাত্রীদের লিফটে আটকা পড়ার ঘটনা ঘটে আসছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অগ্নিকাণ্ডে ছয়জনের প্রাণহানি, জরুরি সিঁড়ি তালাবদ্ধ রাখা, লিফটের অব্যবস্থাপনা এবং রক্ষণাবেক্ষণে অনিয়মের অভিযোগের পর হাসপাতালটির সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার চরম দুর্বলতা উন্মোচিত হয়েছে। ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা এই পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।