রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুন নামের এক তরুণীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকা ওই ফ্ল্যাট থেকে মরিয়মের নিথর দেহ উদ্ধারের পর থেকেই ঘটনাটি ঘিরে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেছেন। এই মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং মরিয়মের মামা ওবায়দুর রহমানকে আসামি করা হয়েছে। কার বিরুদ্ধে কতটা অভিযোগ প্রমাণিত হবে, সেটি তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে এবং মরিয়মের মৃত্যুর চূড়ান্ত কারণও তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে তার মৃত্যুর আগে তিনি কী ধরনের সামাজিক, পারিবারিক ও ডিজিটাল চাপের মধ্যে ছিলেন সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সমাজবিজ্ঞানের আলোচনায় আত্মহত্যাকে শুধু ব্যক্তিগত বা মানসিক সংকট হিসেবে দেখা হয় না। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইমের মতে, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক ও সামাজিক সংহতির ঘাটতিও এমন ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। মরিয়মের ঘটনাতেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গত জুলাইয়ে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে মরিয়মের একটি ব্যক্তিগত ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। ভিডিওটি কে বা কারা প্রথম ছড়িয়েছে, কারা পরে তা প্রচার করেছে এবং এর ফলে মরিয়ম কী ধরনের সামাজিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়েছিলেন, এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আসার দাবি উঠেছে।
কারও ব্যক্তিগত ছবি বা ভিডিও অনুমতি ছাড়া ছড়িয়ে পড়লে সেটি মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে এবং পোস্ট সরিয়ে ফেললেও স্ক্রিনশট বা কপি থেকে যেতে পারে। ফলে ভুক্তভোগীর ব্যক্তিগত পরিসর মুহূর্তের মধ্যে জনসম্মুখে চলে আসে এবং কটূক্তি, বিদ্রূপ কিংবা অবাঞ্ছিত মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। সমাজ ও অপরাধ বিশ্লেষকেরা এ ধরনের ঘটনাকে ‘ডিজিটাল হয়রানি’ বা অনলাইন নিপীড়নের বৃহত্তর বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখছেন। তবে মরিয়মের মৃত্যুর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর সরাসরি সম্পর্ক ছিল কি না, সেটি তদন্ত ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাইফুল আলম বলেন, মরিয়মের পরিবার বিয়ের পর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেছে এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার কথাও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তে নির্ধারিত হবে বলে তিনি মনে করেন। একই সঙ্গে মরিয়মের ব্যক্তিগত সম্পর্ক, ক্ষমতার ভারসাম্য, নিরাপত্তা এবং তার ওপর কোনো ধরনের চাপ ছিল কি না, এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন বলে মত দেন তিনি। তার মতে, একজন মানুষের জীবনে সংকট সাধারণত একটি মাত্র কারণে তৈরি হয় না। সম্পর্কের টানাপোড়েন, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক অপমান, ডিজিটাল হয়রানি, একাকিত্ব, ভয় কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বিভিন্ন চাপ একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
মরিয়মের মৃত্যুর পর তার বিছানা থেকে হাতে লেখা কিছু চিরকুট উদ্ধারের কথাও সংবাদমাধ্যমে এসেছে। সেখানে প্রথম স্ত্রীর অধিকার, ভালোবাসা ভাগ হয়ে যাওয়ার কষ্ট এবং নিজেকে প্রতারিত ও পরাজিত মনে করার মতো অনুভূতির কথা থাকার দাবি করা হয়েছে। এসব চিরকুটের বিষয়বস্তু ও ঘটনার সঙ্গে এর সম্পর্কও তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। অন্যদিকে সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা। কোনো নারী নির্যাতন বা সামাজিক সংকটে পড়লে অনেক সময় তার পাশে দাঁড়ানোর বদলে তার ব্যক্তিগত জীবন, সম্পর্ক কিংবা সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং ভুক্তভোগীর বদলে তার চরিত্রকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আ ক ম জামাল উদ্দিন বলেন, কোনো নারী চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে সামাজিক বা প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা না পেলে নিজেকে একা ও গুরুত্বহীন মনে করতে পারেন। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পারিবারিক বা মানসিক সহিংসতার অভিযোগকে ‘পারিবারিক বিষয়’ হিসেবে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা ভুক্তভোগীর জন্য ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও গবেষক ড. রাসেল হোসেনও মরিয়মের ঘটনাকে বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার আলোকে দেখার পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, পারিবারিক সংকট, সামাজিক বৈষম্য ও একাকিত্বের মতো বিষয়গুলো একজন মানুষের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করতে পারে।
তার মতে, মরিয়মের মৃত্যুর তদন্ত শুধু ফ্ল্যাট, মরদেহ, ময়নাতদন্ত ও এজাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তার জীবনের শেষ কয়েক মাসের ঘটনাপ্রবাহও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর কী ঘটেছিল, কারা তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল, তিনি কোনো হুমকি পেয়েছিলেন কি না এবং কারও কাছে সাহায্য চেয়েছিলেন কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর জানা দরকার। এসব প্রশ্নের উত্তর মরিয়মকে ফিরিয়ে আনতে না পারলেও ভবিষ্যতে একই ধরনের পরিস্থিতিতে থাকা অন্য কাউকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ডিজিটাল যুগে ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানো ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে এবং একটি ব্যক্তিগত মুহূর্ত কয়েক মিনিটের মধ্যে হাজারো মানুষের হাতে পৌঁছে যেতে পারে। মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় আইনি তদন্তের পাশাপাশি ডিজিটাল পরিবেশ, সামাজিক প্রতিক্রিয়া এবং পারিবারিক পরিস্থিতির ভূমিকাও সামনে এসেছে। তার মৃত্যুর জন্য কে বা কারা দায়ী তা তদন্ত ও আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তবে এই ঘটনায় দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীর পরিবার। একই সঙ্গে ঘটনাটি সমাজের সামনে একটি প্রশ্ন রেখে গেছে যে, কোনো মানুষ যখন সংকটে পড়েন, তখন আমরা তাকে সহায়তা করি, নাকি তার ব্যক্তিগত জীবনকে বিচার করার আরও একটি কারণ খুঁজি। একটি মৃত্যুর পর শোক প্রকাশের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরবর্তী এমন মৃত্যু ঠেকাতে সমাজ কতটা প্রস্তুত, তা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।