স্থূলতা নিয়ন্ত্রণ ও হৃদরোগের ঝুঁকি কমাতে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কম চর্বিযুক্ত বা লো-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের যে পরামর্শ দেওয়া হতো, তা নিয়ে বড় ধরনের বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নতুন এক গবেষণা বলছে, পূর্ণ চর্বিযুক্ত বা ফুল-ফ্যাট দুগ্ধজাত খাবার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নয় বরং এটি সুষম খাদ্যের অংশ হতে পারে। ‘দ্য জার্নাল অব নিউট্রিশন’-এ প্রকাশিত এই গবেষণাটি প্রচলিত পুষ্টি বিজ্ঞানের দীর্ঘদিনের ধারণাগুলোকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হার্ভে অ্যান্ডারসনের নেতৃত্বে ৭৪ জন অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের তিনটি ভিন্ন দলে ভাগ করে তাদের খাদ্যতালিকা পর্যবেক্ষণ করা হয়। একটি দল ক্যালরি নিয়ন্ত্রিত এবং কম দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ করে, অন্য দুটি দল দৈনিক তিনবার পূর্ণ চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ করে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১২ সপ্তাহ পর অংশগ্রহণকারীদের ওজন বৃদ্ধি, শরীরের গঠন বা কোলেস্টেরলের মাত্রায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। উল্টো নিয়মিত দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণকারীদের রক্তচাপের উন্নতি ঘটেছে এবং তাদের শরীরে ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও ভিটামিন ডি-এর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত হয়েছে। অধ্যাপক অ্যান্ডারসনের মতে, দৈনিক তিনবার পূর্ণ চর্বিযুক্ত দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণ করলেও রক্তে কোলেস্টেরল বা লিপিডের মাত্রায় কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা যায়নি।
দীর্ঘদিন ধরে পুষ্টিবিদরা মনে করতেন, দুগ্ধজাত খাবারের সম্পৃক্ত চর্বি এলডিএল কোলেস্টেরল বা ‘খারাপ কোলেস্টেরল’ বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু এই নতুন গবেষণা বলছে, দুগ্ধজাত খাবারকে একক কোনো পুষ্টি উপাদান দিয়ে বিচার করা ভুল। গবেষকদের মতে, প্রোটিন, খনিজ, ভিটামিন ও চর্বির সমন্বয়ে গঠিত দুগ্ধজাত খাবার একটি ‘সম্পূর্ণ খাদ্য ম্যাট্রিক্স’ হিসেবে কাজ করে, যা শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় ভিন্ন প্রভাব ফেলে।
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান খাদ্য নির্দেশিকায় এখনো চর্বিহীন দুগ্ধজাত খাবার গ্রহণের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে নতুন এই তথ্য বলছে, দুগ্ধজাত খাবারের লেবেলে উল্লিখিত চর্বির পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সেটিকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর বা উপকারী হিসেবে চিহ্নিত করার দিন শেষ হতে চলেছে। হার্ভার্ডের ২০১৮ সালের একটি বৃহৎ বিশ্লেষণও ইতিপূর্বে ইঙ্গিত দিয়েছিল যে, দুগ্ধজাত চর্বি সরাসরি হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।
পুষ্টি বিজ্ঞানের এই নতুন মোড় চিকিৎসা জগতের প্রচলিত ধারণাকে কেবল জটিলই করেনি, বরং খাদ্যাভ্যাস নিয়ে পুনর্বিবেচনার পথ প্রশস্ত করেছে। গবেষকরা এখন একক পুষ্টি উপাদানের চেয়ে খাবারের সামগ্রিক উপাদানের মিথস্ক্রিয়ার ওপর অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। অর্থাৎ, একটি খাবারের গুণাগুণ কেবল তার চর্বির পরিমাণের ওপর নয়, বরং তার ভেতরের বিভিন্ন উপাদানের জটিল সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করে।