এআই চিপের জোয়ারে তাইওয়ানের প্রবৃদ্ধি ১২.৯২ শতাংশ, ট্রাম্প ও চীন ইস্যুতে তবুও কাটছে না দীর্ঘমেয়াদি শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চিপের আকাশচুম্বী চাহিদার ওপর ভর করে এক অভাবনীয় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাইওয়ান। তবে এই চোখধাঁধানো সাফল্যের সমান্তরালে মার্কিন রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং চীনের ভূরাজনৈতিক বৈরিতা তাইওয়ানের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির এই জোয়ার তাইওয়ানকে এশিয়ার ‘টাইগার ইকোনমি’ হিসেবে পুনরুত্থিত করলেও বেইজিং ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার জটিল সমীকরণ দেশটির টেকসই ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তুলছে।
সাম্প্রতিক বাণিজ্য পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে তাইওয়ানের প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে। গত বছর তাইওয়ান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানির পরিমাণ ছিল ২০১ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৪ সালের ১১৬ বিলিয়ন ডলারের প্রায় দ্বিগুণ। গত মে মাসে মেক্সিকো এবং কানাডার পর তাইওয়ান চীনকে টপকে যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম পণ্য আমদানির উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে এর ক্রমবর্ধমান গুরুত্বকে তুলে ধরে।
এআই চিপের বৈশ্বিক চাহিদার ওপর ভর করে তাইওয়ানের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২০২৫ সালে ৮.৬৩ শতাংশে উন্নীত হয়। প্রবৃদ্ধির এই উর্ধ্বমুখী ধারা চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আরও গতিশীল হয়ে ১৩.৬৯ শতাংশে পৌঁছায় এবং সর্বশেষ জুন মাসে শেষ হওয়া দ্বিতীয় প্রান্তিকে দেশের অর্থনীতি রেকর্ড ১২.৯২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো ডেক্সটার টিফ রবার্টস জানান, বিশ্বের উন্নত এআই চিপের প্রায় ৯০ শতাংশই তাইওয়ানে উৎপাদিত হওয়ায় এই জোরালো প্রবৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদি রূপ পেতে যাচ্ছে।
এদিকে মার্কিন বাজারে তাইওয়ানি প্রযুক্তির অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের সাথে তাইওয়ান ৫০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বৃহৎ বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এই চুক্তির আওতায় অর্ধেক অর্থ সরাসরি তাইওয়ানি সেমিকন্ডাক্টর ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মার্কিন ভূখণ্ডে বিনিয়োগ করা হবে। বিনিময়ে তাইওয়ানি প্রতিষ্ঠানগুলো কোনো শুল্ক ছাড়াই তাদের মার্কিন কারখানার উৎপাদিত আড়াই গুণ পণ্য আমদানি করতে পারবে এবং বিপরীতে তাইওয়ানও মার্কিন রপ্তানির ৯৯ শতাংশ পণ্যে শুল্ক হ্রাস করতে সম্মত হয়েছে।
তবে এই আপাত অংশীদারিত্বের আড়ালে ঘনীভূত হচ্ছে নতুন শঙ্কা। আলবার্টা ইউনিভার্সিটির চায়না ইনস্টিটিউটের একাডেমিক উপদেষ্টা রেজা হাসমাথ সতর্ক করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তাইওয়ানের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা ট্রাম্পের কঠোর বাণিজ্য নীতির সাথে সাংঘর্ষিক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সহযোগী দেশগুলোর সাথে বাণিজ্য ঘাটতি দূর করার পক্ষে এবং যেকোনো সময় এই বিপুল বাণিজ্য উদ্বৃত্তের কারণে চুক্তিগুলো পুনর্বিবেচনা করতে পারেন।
তাছাড়া তাইওয়ানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও এক ধরনের কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা বা ‘কে-শেপড’ প্রবৃদ্ধির চিত্র ফুটে উঠছে, কারণ এই অভাবনীয় অগ্রগতির সুফল সর্বস্তরের মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। প্লাস্টিক ও টেক্সটাইলের মতো দেশের ঐতিহ্যবাহী রপ্তানি খাতগুলো বর্তমানে বেশ ধুঁকছে এবং চিপ শিল্পে সর্বোচ্চ সাড়ে তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে, যা মোট জনসংখ্যার অত্যন্ত ক্ষুদ্র অংশ। এর ফলে এআই খাতের সঙ্গে যুক্ত একটি সুনির্দিষ্ট শ্রেণি লাভবান হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠী এই প্রবৃদ্ধির সুফল থেকে বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।
অন্যদিকে তাইওয়ানের একক বৃহত্তম চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টিএসএমসি একাই দেশের শেয়ারবাজারের ৪০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে এবং জিডিপিতে ৪ শতাংশ অবদান রাখে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এর সাথে যুক্ত হয়েছে দেশের তীব্র পানি সংকট, আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতি-নির্ভরশীলতা এবং দ্রুত বৃদ্ধ হতে থাকা জনসংখ্যা, যেখানে এক-পঞ্চমাংশের বয়স ৬৫ বছরের ওপরে। এই পরিস্থিতির মধ্যে বেইজিং সতর্ক করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা তাইওয়ানের নিজস্ব মূল অর্থনৈতিক কাঠামোকে ফাঁপা করে দেবে, যা দীর্ঘমেয়াদে তাইপেইয়ের রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তনের কারণ হতে পারে।
