AdvertisementAdvertisement

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সত্তর বছরের পথচলা ও মুখ ও মুখোশ ছবির ঐতিহাসিক জয়যাত্রা

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের রূপালি পর্দায় আজ এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। ঠিক সাত দশক আগে ১৯৫৬ সালের এই দিনে ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছিল ‘মুখ ও মুখোশ’। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে নির্মিত এই প্রথম সবাক পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রটি কেবল একটি সিনেমা ছিল না, বরং তা ছিল একটি জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠার সাহসী ঘোষণা। তৎকালীন গভর্নর শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের হাত ধরে যাত্রা শুরু করা এই ছবিটিই প্রমাণ করেছিল যে, সকল প্রতিকূলতা জয় করে এ দেশের মাটিতেও বিশ্বমানের বাংলা সিনেমা নির্মাণ সম্ভব।

১৯৫৩ সালে যখন চলচ্চিত্র নির্মাণের ধারণা নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল এবং অনেকেই বলেছিলেন এ দেশের আবহাওয়া চলচ্চিত্র নির্মাণের উপযোগী নয়, তখন নাট্যকর্মী আবদুল জব্বার খান এক অদম্য চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। স্টুডিও, ল্যাব কিংবা অভিজ্ঞ কলাকুশলী—কিছুরই পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল না। পুরোনো আইমো ক্যামেরা আর সাধারণ টেপ রেকর্ডার সম্বল করে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েন ইতিহাসের পাতায় নাম লেখাতে। সেই স্বপ্নযাত্রায় সঙ্গী হয়েছিলেন জহরত আরা, পিয়ারী বেগম ও পূর্ণিমা সেনগুপ্তর মতো সাহসী নারীরা। যাঁদের বেশিরভাগেরই ছিল না অভিনয়ের পূর্ব অভিজ্ঞতা। সমর দাসের সুর আর আবদুল আলীমের কণ্ঠে সেই চলচ্চিত্রের প্রতিটি দৃশ্য আজও বাঙালির মনে অম্লান হয়ে আছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

‘মুখ ও মুখোশ’ পরবর্তী সাত দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অনেক চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়েছে। একসময় যেখানে হাজার ছাড়িয়েছিল প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা, সেখানে বর্তমান প্রেক্ষাপট ভিন্ন। আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি, বিশ্বমানের ক্যামেরা আর পোস্ট-প্রোডাকশনের সমস্ত সুবিধা থাকার পরও মানসম্মত গল্পের অভাব এবং দর্শক খরা এই শিল্পকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে। তবে আশার আলো দেখাচ্ছেন বর্তমান প্রজন্মের তরুণ নির্মাতারা, যাদের হাত ধরে নির্মিত আধুনিক ঘরানার সিনেমাগুলো আবারও প্রেক্ষাগৃহে দর্শকের ভিড় ফিরিয়ে আনছে।

এই মহিমান্বিত ৭০ বছর পূর্তিতে রোববার চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে আয়োজিত পোস্টার প্রদর্শনীতে উঠে আসে সিনেমার সোনালী অতীত ও বর্তমানের টানাপোড়েন। অনুষ্ঠানে উপস্থিত গুণী নির্মাতা কাজী হায়াৎ, মতিন রহমানসহ চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিত্বরা একবাক্যে স্বীকার করেন যে, চলচ্চিত্র কখনোই মরে না। ভালো গল্পের অভাব পূরণ এবং আধুনিক সিনেপ্লেক্স নির্মাণের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত থাকলে বাংলা সিনেমা তার হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

আজকের এই দিনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সেই পথিকৃৎদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছে পুরো দেশ। ‘মুখ ও মুখোশ’ কেবল একটি ছবির নাম নয়, এটি সেই সাহস ও স্বপ্নের প্রতীক, যা আজও নতুন প্রজন্মের নির্মাতাদের পথ দেখাচ্ছে। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর সৃজনশীলতার মেলবন্ধনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আগামী দিনে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এটাই আজকের দিনের প্রত্যাশা।

0%
0%
0%
0%