ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কেন নাগালের মধ্যে রয়েছে

চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার আবহে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যে মাত্রায় বৃদ্ধির আশঙ্কা করা হয়েছিল, বাস্তব চিত্র তার চেয়ে অনেকটাই ভিন্ন। ইরান ও ইসরায়েল কেন্দ্রিক সামরিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষকদের ধারণা ছিল, বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ হরমুজ প্রণালি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে। তবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলার পর্যন্ত উঠলেও তা ২০০৮ সালের আর্থিক মন্দার সময়কার রেকর্ড ১৪৭ ডলারের নিচেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে ব্যারেলপ্রতি তেলের দাম ছিল প্রায় ৭২ ডলার, যা যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পূর্ব পর্যন্ত গড়ে ১০১ ডলারে অবস্থান করে। বর্তমানে দাম কিছুটা বেড়ে ৯০ ডলার অতিক্রম করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
জ্বালানি বাজারের এই স্থিতিশীলতার পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক নিয়ামক কাজ করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবটি এসেছে বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীন থেকে, যেখানে জুন মাস পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের চাহিদা এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে। দেশটিতে জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং পেট্রোকেমিক্যাল খাতে চাহিদার সংকোচন বিশ্ববাজারের ওপর চাপ কমিয়েছে। পাশাপাশি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তেল উৎপাদন রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দৈনিক ১ কোটি ৩৯ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেলে পৌঁছেছে, যা দেশটিকে নিট রপ্তানিকারক দেশে পরিণত করেছে।
সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত মজুত থেকে বাজারে তেল ছেড়েছে। একইসঙ্গে সৌদি আরব লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর দিয়ে রপ্তানি বৃদ্ধির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীলতা ও সরবরাহের ঝুঁকি কিছুটা লাঘব করতে সক্ষম হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে উত্তর সাগরের ফোর্টিজ গ্রেডের মতো তাৎক্ষণিক সরবরাহযোগ্য তেলও প্রিমিয়ামের পরিবর্তে ছাড়ে বিক্রি হচ্ছে, যা প্রমাণ করে যে বাজারে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত রয়েছে এবং ক্রেতাদের মধ্যে কোনো আতঙ্ক নেই।
বাজারের এই অনিশ্চিত পরিস্থিতির পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিভিন্ন মন্তব্যেরও ভূমিকা রয়েছে। শান্তি আলোচনা বা হরমুজ প্রণালি দিয়ে পুনরায় নিরবচ্ছিন্ন পরিবহন শুরুর সম্ভাবনা নিয়ে তাঁর ঘনঘন বক্তব্যে বিনিয়োগকারীরা বড় ধরনের মজুত বা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। অক্সফোর্ড ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি স্টাডিজের ইলিয়া বুচুয়েভ জানান, তেলের দাম বৃদ্ধির প্রত্যাশা থাকা সত্ত্বেও বড় বিনিয়োগকারীরা এখন ঝুঁকি এড়াতে চাইছেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে বিনিয়োগে কিছুটা গতি ফিরলেও বর্তমানে এর পরিমাণ ১৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা মার্চের শেষদিকের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।
পরিশেষে, তেলের বাজার আপাতত সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কামুক্ত থাকলেও ব্যবসায়ীরা সতর্কবার্তা দিয়েছেন। বাজারে এখন পর্যাপ্ত অপরিশোধিত তেল থাকলেও যুদ্ধের তীব্রতা ও ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে এই স্থিতিশীলতা বজায় না-ও থাকতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি নির্দেশ করছে যে, কেবল যুদ্ধের সংবাদের ওপর ভিত্তি করে জ্বালানি তেলের দাম লাগামহীনভাবে বৃদ্ধির দিন শেষ হয়েছে, বরং এখন বাজার পরিস্থিতির ওপর উৎপাদন ও চাহিদার প্রকৃত ভারসাম্যই বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।