একটি ছেলে রাতে বাড়ি ফিরছে। চোখ লাল, আচরণ অস্বাভাবিক। বাবা-মা বুঝতে পারছেন কিছু একটা বদলে গেছে। কিন্তু প্রশ্ন করতে ভয় পাচ্ছেন। হয়তো ভাবছেন—‘বয়স হয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে।’
সবাই যদি এভাবেই ভাবতে থাকে, তাহলে ঠিক হবে কীভাবে?
মাদক কখনো হঠাৎ করে একটি পরিবারে ঢোকে না। প্রথমে আসে কৌতূহল হয়ে। তারপর বন্ধুত্বের হাত ধরে। এরপর অভ্যাস। একসময় সেই অভ্যাসই হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রণকারী শক্তি।
আর তখন শুধু একজন তরুণ নষ্ট হয় না—ভেঙে পড়ে একটি পরিবার।
আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতাগুলোর একটি হলো মাদকের বিস্তার। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইনসহ নানা ধরনের মাদক সহজলভ্য হয়ে উঠছে। শহর থেকে গ্রাম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ থেকে অলিগলি—মাদকের বিস্তার এখন আর কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা এলাকার সমস্যা নয়।
প্রশ্ন হলো—মাদক আসে কোথা থেকে?
একজন আসক্ত তরুণ হয়তো ১০০ টাকার মাদক কিনেছে। কিন্তু সেই মাদক তার হাতে পৌঁছানোর আগে বহু হাত বদলেছে। তাহলে শুধু ব্যবহারকারী ধরা পড়লেই কি মাদক নির্মূল হবে?
একজন মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করা সহজ। কিন্তু যে চক্র তাকে মাদক সরবরাহ করছে, যে চক্র কোটি কোটি টাকার ব্যবসা করছে, তাদের কাছে পৌঁছানোই আসল চ্যালেঞ্জ।
আমরা প্রায়ই সংবাদে দেখি—‘অমুক স্থান থেকে মাদকসহ একজন গ্রেপ্তার।’
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
যে ব্যক্তি ধরা পড়ল, তার পেছনে কে?
যে সরবরাহ করল, সে কোথায়?
যে অর্থের লেনদেন করল, সে কোথায়?
আর যে পুরো নেটওয়ার্ক চালায়, সে কতটা নিরাপদ?
শুধু বাহক ধরে মাদক ব্যবসা বন্ধ করা যাবে না।
মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান হতে হবে সরবরাহ চেইনের বিরুদ্ধে। মূল হোতা, অর্থদাতা, সরবরাহকারী এবং তাদের সহযোগীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
আরেকটি ভয়াবহ বাস্তবতা হলো—মাদকাসক্তদের অনেকেই বয়সে খুবই তরুণ।
যে বয়সে একজন তরুণের হাতে বই থাকার কথা, সেই হাতে যদি মাদক উঠে আসে, তাহলে প্রশ্নটা শুধু পরিবারের নয়; রাষ্ট্রেরও।
যে বয়সে তার স্বপ্ন দেখার কথা, সে যদি নেশার ঘোরে ভবিষ্যৎ হারিয়ে ফেলে, তাহলে একটি প্রজন্মের সম্ভাবনা আমরা নিজেরাই ধ্বংস করছি।
তবে মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু গ্রেপ্তার নয়।
একজন আসক্ত মানুষকে শুধু অপরাধী হিসেবে দেখলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। অনেক ক্ষেত্রে তাকে চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিক সহায়তার প্রয়োজন হয়। কিন্তু একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের বিকল্পও নেই।
এখানে পরিবারের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সন্তানের আচরণ হঠাৎ বদলে গেলে আমরা কি খেয়াল করি?
সে কার সঙ্গে মিশছে?
কোথায় যাচ্ছে?
অতিরিক্ত টাকা কোথা থেকে আসছে?
হঠাৎ পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়ছে কেন?
ঘরে থেকেও কেন একা থাকতে চাইছে?
এসব প্রশ্ন করা ‘অতিরিক্ত শাসন’ নয়। অনেক সময় এগুলোই একজন তরুণকে বিপদ থেকে ফিরিয়ে আনার প্রথম সুযোগ।
কিন্তু পরিবারও সবসময় দায়মুক্ত নয়।
সন্তান মাদকাসক্ত হওয়ার পর বিষয়টি লুকিয়ে রাখলে সমস্যার সমাধান হয় না। বরং সমস্যা আরও গভীরে যায়।
‘মানুষ কী বলবে’—এই ভয় অনেক পরিবারকে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পথ থেকেও দূরে রাখে।
মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্তিকে লুকিয়ে রাখা কোনো সম্মান রক্ষা নয়। বরং তা সমস্যাকে আরও ভয়াবহ করে।
আর সমাজ?
আমরা অনেক সময় জানি কোথায় মাদক বিক্রি হয়। জানি কারা জড়িত। জানি কারা নিয়মিত সেখানে যাতায়াত করে।
কিন্তু জানার পরও চুপ থাকি।
কারণ ভয়।
কখনো সামাজিক চাপের ভয়, কখনো প্রতিশোধের ভয়, কখনো ‘আমার কী দরকার’—এই মানসিকতা।
এই নীরবতা ভাঙতে হবে।
কারণ মাদক শুধু একজনের জীবন নষ্ট করে না। মাদক থেকে চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক সহিংসতা, অপরাধপ্রবণতা—নানা সামাজিক সংকট তৈরি হতে পারে।
একজন মাদকাসক্ত তরুণের পেছনে একটি অসহায় মা থাকতে পারেন। একজন আতঙ্কিত বাবা থাকতে পারেন। ভাই-বোনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হতে পারে।
অর্থাৎ মাদক ব্যবসার লাভ গুনছে কয়েকজন; কিন্তু এর মূল্য দিচ্ছে পুরো সমাজ।
তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াইকে শুধু ‘অভিযান’ হিসেবে দেখলে হবে না। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কৌশল।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। মাদকপ্রবণ এলাকায় নজরদারি জোরদার করতে হবে। মাদকবিরোধী আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়াতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—মাদক ব্যবসার সঙ্গে কোনো ধরনের আপস করা যাবে না।
কারণ এখানে আপস মানে একজন তরুণের ভবিষ্যতের সঙ্গে আপস।
একটি ইয়াবার প্যাকেট শুধু একটি ছোট প্যাকেট নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে একটি পরিবারের কান্না, একটি মায়ের ঘুমহীন রাত, একজন বাবার অসহায়ত্ব এবং একজন তরুণের নষ্ট হয়ে যাওয়া ভবিষ্যৎ।
তাই প্রশ্নটা এখন খুব সরল—
আমরা কি মাদককে নির্মূল করতে চাই, নাকি শুধু মাদকসহ মানুষ গ্রেপ্তারের সংবাদ প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করতে চাই?
একজন ব্যবহারকারীকে ধরে সংবাদে সাফল্য দেখানো সহজ।
কিন্তু মাদকের মূল শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন।
আর কঠিন কাজটাই এখন করতে হবে।
কারণ আজ যদি আমরা ভাবি—‘আমার সন্তান তো মাদক নেয় না’, তাহলে ভুল করছি।
মাদক কোনো দরজায় কড়া নাড়ার আগে অনুমতি নেয় না।
এটি যে কোনো পরিবারে ঢুকতে পারে।
তাই মাদকের বিরুদ্ধে লড়াই কারও একার নয়।
একটি প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে এখনই জাগতে হবে।
নইলে একদিন হয়তো আমরা প্রশ্ন করব—আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ কোথায় গেল?
আর তখন উত্তর খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন হবে।
মাদককে ভয় নয়—মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে ভয়হীন প্রতিরোধই হোক আমাদের অঙ্গীকার।