একটি মেয়ে রাস্তা দিয়ে হাঁটছে। কয়েকজন তরুণ দাঁড়িয়ে আছে মোড়ে। মেয়েটিকে দেখেই শুরু হলো ফিসফাস, অশ্লীল মন্তব্য, শিস, হাসাহাসি। মেয়েটি গতি বাড়িয়ে দিল। মাথা নিচু করল। হয়তো প্রতিবাদ করতে পারত, কিন্তু করল না। কারণ সে জানে—প্রতিবাদ করলেই বিষয়টি আরও বড় হতে পারে।
এ দৃশ্য আমাদের সমাজে নতুন নয়।
এতটাই পরিচিত যে, আমরা অনেক সময় আর থমকেও দাঁড়াই না।
এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর।
যে সমাজে একজন নারী বা কিশোরী রাস্তায় বের হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারবে কি না—তা নিয়ে তাকে ভাবতে হয়, সে সমাজকে সভ্য সমাজ বলা কঠিন।
আর আমরা সেখানে দাঁড়িয়ে বলি—‘ইভটিজিং তো এখন হয়েই থাকে।’
না, হয়েই থাকে না।
আমরা হতে দিই।
ইভটিজিং কোনো ছেলেমানুষি নয়, মজা নয়, কিশোর বয়সের দুষ্টুমি নয়। এটি একজন মানুষের স্বাধীনভাবে চলাফেরা, মানসিক নিরাপত্তা এবং মর্যাদার ওপর আঘাত। আজ যে আচরণকে আমরা ‘মজা’ বলে এড়িয়ে যাচ্ছি, কাল সেটিই আরও গুরুতর হয়রানি, stalking কিংবা সহিংসতার দিকে গড়াতে পারে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, অপরাধীরা এতটা নির্ভীক হয় কীভাবে?
কারণ তারা জানে—অনেকেই দেখবে, কিন্তু কেউ কিছু বলবে না।
দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি দেখবে। পাশ দিয়ে যাওয়া পথচারী দেখবে। বন্ধুরা দেখবে। কখনো কখনো শিক্ষকও জানবেন। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়া হবে—‘এসব ঝামেলায় জড়াব না।’
এই ‘ঝামেলায় না জড়ানোর’ মানসিকতাই অপরাধীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
একজন কিশোরীকে উত্ত্যক্ত করার সময় যদি পাঁচজন মানুষ একসঙ্গে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘বন্ধ করুন’, তাহলে অপরাধীর সাহস অনেকটাই সেখানেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু পাঁচজন যদি পাঁচ দিকে তাকিয়ে থাকেন, তাহলে অপরাধী বুঝে যায়—এই সমাজে তাকে থামানোর কেউ নেই।
আর এখানেই আমাদের সামাজিক ব্যর্থতা।
আমরা প্রায়ই ভুক্তভোগীকে প্রশ্ন করি।
‘মেয়েটা ওই রাস্তা দিয়ে কেন গেল?’
‘একা কেন বের হলো?’
‘ওর পোশাক এমন কেন?’
কিন্তু খুব কম মানুষ অপরাধীকে জিজ্ঞেস করে—
‘তুমি তাকে উত্ত্যক্ত করার সাহস কোথায় পেলে?’
এই প্রশ্নটাই আসল।
কারও পোশাক, চলাফেরা কিংবা বাইরে বের হওয়ার সময় কোনোভাবেই তাকে উত্ত্যক্ত করার লাইসেন্স হতে পারে না। অপরাধের দায় অপরাধীর। ভুক্তভোগীর নয়।
আর পরিবার?
সেখানেও আমাদের আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
আমরা মেয়েকে বলি—‘সাবধানে চলবে।’
‘কারও সঙ্গে কথা বলবে না।’
‘সন্ধ্যার পর বাইরে থাকবে না।’
‘সমস্যা হলে চুপ থাকবে।’
কিন্তু ছেলেকে কি একইভাবে বলি—‘কাউকে উত্ত্যক্ত করবে না’?
‘কোনো মেয়েকে নিয়ে অশ্লীল মন্তব্য করবে না’?
‘বন্ধু করলেও অন্যায়ের সঙ্গে থাকবে না’?
সমস্যাটা এখানেই।
একজন মেয়েকে নিরাপদ থাকার শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি একজন ছেলেকেও অন্যের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার শিক্ষা দিতে হবে।
কারণ নিরাপদ সমাজ তৈরি হয় শুধু মেয়েদের সতর্ক করে নয়; অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণ করেই।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বও এখানে কম নয়। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ, বাসস্ট্যান্ড, বাজার, নির্জন সড়ক ও জনসমাগমস্থলে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন। অভিযোগ পাওয়ার পর ‘দেখছি’ বলে ফাইল বন্ধ করে দিলে হবে না। দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগকারীকে সামাজিক হয়রানি থেকে সুরক্ষা দিতে হবে।
কারণ অনেক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন না অপরাধীর ভয়ে নয়—বরং সমাজের ভয়ে।
এটি আরও ভয়ংকর।
একটি মেয়ে হয়তো পুলিশের কাছে যেতে চায়, কিন্তু ভয় পায়—পরিবার কী বলবে? প্রতিবেশীরা কী বলবে? সহপাঠীরা কী বলবে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাকে নিয়ে কী লেখা হবে?
অর্থাৎ অপরাধী একজন, কিন্তু ভুক্তভোগীকে মোকাবিলা করতে হয় পুরো সমাজকে।
এই সংস্কৃতি বদলাতে হবে।
ইভটিজিং বন্ধের দায়িত্ব শুধু পুলিশের নয়। স্কুল-কলেজ কর্তৃপক্ষেরও দায়িত্ব আছে। অভিভাবকদের দায়িত্ব আছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দায়িত্ব আছে। গণমাধ্যমের দায়িত্ব আছে। সবচেয়ে বেশি দায়িত্ব আছে আমাদের প্রত্যেকের।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া দরকার—আইনের ভয় ছাড়া শুধু নৈতিকতার কথা বলে এই সমস্যা পুরোপুরি বন্ধ করা যাবে না।
অপরাধ করলে শাস্তি হবে—এই বিশ্বাসটি দৃশ্যমান করতে হবে।
যে এলাকায় নিয়মিত ইভটিজিং হয়, সেখানে নিয়মিত নজরদারি নেই কেন? অভিযোগের পর কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো কী পদক্ষেপ নিয়েছে? স্থানীয় প্রশাসন কী করেছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর চাইতে হবে।
কারণ একটি সমাজের নিরাপত্তা শুধু বড় বড় প্রকল্প দিয়ে মাপা যায় না। একটি কিশোরী বিকেলে স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার সময় কতটা নিরাপদ—সেটিও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
আমরা কেমন বাংলাদেশ চাই?
এমন বাংলাদেশ, যেখানে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর সময় মা-বাবাকে প্রতিদিন ভয় করতে হবে?
নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে একজন মেয়ে একা রাস্তায় হাঁটলেও তার নিরাপত্তা নিয়ে কাউকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না?
সিদ্ধান্তটা আমাদের।
তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গেছে।
কারণ রাস্তাঘাট শুধু অপরাধীদের জন্য নয়। ফুটপাত, বাজার, স্কুলের সামনের রাস্তা, বাসস্ট্যান্ড—সবই সাধারণ মানুষের।
মেয়েদের ঘরে আটকে রেখে নিরাপদ সমাজ তৈরি করা যায় না। অপরাধীদের রাস্তা থেকে সরিয়েই নিরাপদ সমাজ তৈরি করতে হয়।
আজ যদি ইভটিজিংকে ‘সামান্য ব্যাপার’ বলে এড়িয়ে যাই, কাল বড় অপরাধের দায়ও আমাদের নিতে হবে।
তাই এখন সময় এসেছে প্রশ্নটা উল্টো করে দেওয়ার—
মেয়েরা কেন পথ চলতে ভয় পাবে?
ভয় পাওয়ার কথা তো অপরাধীর।