মতামত ⏱️ ৬ মিনিট পাঠ

কিশোর গ্যাং: কৈশোরের হাতে বই থাকার কথা, অস্ত্র কেন?

আল আমিন
প্রকাশক ও সম্পাদক
০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:০৫ এএম

যে বয়সে একটি শিশুর হাতে থাকার কথা বই, খাতা কিংবা ক্রিকেট ব্যাট—সে বয়সে যদি তার হাতে উঠে আসে ছুরি, চাপাতি কিংবা অন্য কোনো অস্ত্র, তাহলে ভয় পাওয়ার কারণ শুধু ওই কিশোর নয়।

ভয় পাওয়ার কারণ হলো—আমরা তাকে সেখানে পৌঁছাতে দিলাম কীভাবে?

কিশোর গ্যাং এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। শহরের অলিগলি থেকে শুরু করে মফস্বলের বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশ কিংবা পাড়া-মহল্লা—কিশোরদের একটি অংশ দলবদ্ধ হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। মারামারি, ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মাদক, অস্ত্র বহন কিংবা আধিপত্য বিস্তার—অপরাধের ধরনও দিন দিন ভয়ংকর হয়ে উঠছে।

কিন্তু প্রতিবার কোনো কিশোর গ্রেপ্তার হলে আমরা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি।

কয়েকজনকে ধরে ছবি প্রকাশ হলো, মামলা হলো, সংবাদ হলো—ব্যস, দায়িত্ব শেষ।

কিন্তু আসল প্রশ্নটি থেকে যায়—

এই কিশোরদের পেছনে কারা?

একজন ১৪-১৫ বছরের কিশোর হঠাৎ করে অপরাধী হয়ে ওঠে না। তার পেছনে থাকে একটি পরিবেশ, কিছু বন্ধুত্ব, কিছু প্রভাব, কিছু সুযোগ এবং অনেক সময় বড়দের তৈরি করে দেওয়া অপরাধের কাঠামো।

কিশোরকে ব্যবহার করে যারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করে, তাদের বিষয়ে আমরা কতটা কথা বলি?

যে বড় ভাই কিশোরদের হাতে অস্ত্র তুলে দেয়, যে ব্যক্তি তাদের দিয়ে ভয় দেখায়, যে মাদক সরবরাহ করে, যে প্রভাবশালী ব্যক্তি অপরাধের পর তাদের রক্ষা করার চেষ্টা করে—তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা দৃশ্যমান?

শুধু কিশোরকে ধরে সমস্যার সমাধান হবে না।

মাছ ধরতে হলে শুধু জাল নয়, নদীর স্রোতও বুঝতে হয়।

কিশোর গ্যাংয়ের ক্ষেত্রেও একই কথা।

একজন কিশোর অপরাধ করেছে—তার দায় অবশ্যই আছে। কিন্তু সেই অপরাধকে উৎসাহিত, সংগঠিত বা অর্থায়ন করছে যারা, তাদের দায় আরও বড়।

এখানে পরিবারকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড়াতে হবে।

সন্তান কখন বাসায় ফিরছে, কার সঙ্গে মিশছে, হঠাৎ তার হাতে দামি মোবাইল বা টাকা আসছে কোথা থেকে, পড়াশোনায় কেন অমনোযোগী হচ্ছে, আচরণ কেন বদলে যাচ্ছে—এসব কি আমরা খেয়াল করছি?

অনেক পরিবার সন্তানকে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারে না। কেউ অর্থ দিয়ে দায়িত্ব শেষ মনে করেন, কেউ আবার সন্তানের ভুল দেখেও ‘বয়স কম’ বলে এড়িয়ে যান।

কিন্তু বয়স কম বলে অপরাধের ঝুঁকি কমে যায় না।

বরং কৈশোরেই যদি ভুল পথে যাওয়ার শুরু হয়, তা পরে আরও গভীর হতে পারে।

তবে শুধু পরিবারকে দোষ দিলেও সমস্যার সমাধান হবে না।

একটি কিশোর দিনের বড় অংশ কোথায় কাটায়?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

তাহলে স্কুল-কলেজের আশপাশে কারা ঘোরাফেরা করে, শিক্ষার্থীরা কার সঙ্গে মিশছে, কারা তাদের প্রভাবিত করছে—এসব দেখার দায়িত্ব কি শুধু অভিভাবকের?

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শুধু পরীক্ষার ফল প্রকাশের জায়গা বানালে চলবে না। শিক্ষার্থীর আচরণগত পরিবর্তন, সহিংসতা, মাদক ও অপরাধপ্রবণতা শনাক্ত করার ব্যবস্থাও থাকতে হবে।

আর সমাজ?

সেখানেও আমাদের দায় আছে।

আমরা অনেক সময় জানি কোন কিশোর কোন দলের সঙ্গে ঘোরে। জানি কারা রাতে আড্ডা দেয়। জানি কোথায় মাদক কেনাবেচা হয়। জানি কারা এলাকায় ভয় দেখায়।

কিন্তু আমরা চুপ থাকি।

কারণ—‘ঝামেলায় যাব না।’

এই নীরবতাই একদিন পুরো এলাকার ঝামেলা হয়ে দাঁড়ায়।

আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—অপরাধ ঘটার পর ব্যবস্থা নেওয়া, নাকি অপরাধ ঘটার আগেই ঝুঁকিপূর্ণ কিশোরদের শনাক্ত করে প্রতিরোধ করা?

অপরাধের পর গ্রেপ্তার জরুরি। কিন্তু তার চেয়েও জরুরি হলো অপরাধের পরিবেশ ভেঙে দেওয়া।

যেসব এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা রয়েছে, সেখানে নিয়মিত নজরদারি, মাদকবিরোধী অভিযান, অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্তকরণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে তথ্যভিত্তিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রয়োজন।

তবে এখানেও ভারসাম্য জরুরি।

প্রতিটি আড্ডা দেওয়া কিশোর অপরাধী নয়। কয়েকজন বন্ধুর একসঙ্গে হাঁটা মানেই কিশোর গ্যাং নয়।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে সব কিশোরকে সন্দেহের চোখে দেখাও সমাধান নয়।

যে কিশোর ভুল পথে যাচ্ছে তাকে শাস্তির পাশাপাশি ফেরার পথও দেখাতে হবে।

খেলাধুলার মাঠ দরকার। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড দরকার। পাঠাগার দরকার। কাউন্সেলিং দরকার। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পরিবারের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ দরকার।

কারণ একটি কিশোরকে শুধু ভয় দেখিয়ে ভালো মানুষ বানানো যায় না। তাকে বিকল্পও দিতে হয়।

যে এলাকায় মাঠ নেই, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নেই, নিরাপদ বিনোদনের জায়গা নেই, সেখানে কিশোরদের সময় দখল করবে অন্য কেউ—হয়তো মাদক ব্যবসায়ী, হয়তো অপরাধী চক্র, হয়তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কোনো বিপজ্জনক প্রভাব।

তাই কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে লড়াই আসলে শুধু আইনশৃঙ্খলার লড়াই নয়।

এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিয়ে লড়াই।

আজ একজন কিশোরকে অপরাধের জগৎ থেকে ফিরিয়ে আনা মানে শুধু একজনকে বাঁচানো নয়; তার পরিবারকে বাঁচানো, একটি সম্ভাবনাকে বাঁচানো, একটি সমাজকে বাঁচানো।

আর যদি আমরা ব্যর্থ হই?

তাহলে আজকের কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যই আগামী দিনের আরও সংগঠিত অপরাধী হতে পারে।

তখন প্রশ্ন করেও লাভ হবে না—‘ওরা এমন হলো কেন?’

কারণ উত্তরটা হয়তো আমাদের সামনেই থাকবে।

আমরা সময়মতো দেখিনি।

আমরা শুনিনি।

আমরা প্রতিবাদ করিনি।

আমরা প্রতিরোধ করিনি।

কৈশোর অপরাধের কারখানা নয়।

একটি কিশোরের হাতে অস্ত্র দেখলে শুধু কিশোরটির দিকে তাকাব না—তার পেছনে থাকা পুরো ব্যবস্থাটির দিকে তাকাতে হবে।

কে তাকে ব্যবহার করছে?

কে তাকে মাদক দিচ্ছে?

কে তাকে ভয় দেখাতে শেখাচ্ছে?

কে তাকে রক্ষা করছে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

আমরা কি তাকে অপরাধী হওয়ার আগেই ফিরিয়ে আনতে যথেষ্ট চেষ্টা করেছি?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না খুঁজে শুধু কয়েকজন কিশোরকে গ্রেপ্তার করে কিশোর গ্যাং নির্মূলের দাবি করা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছু নয়।

কারণ কিশোর গ্যাংয়ের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযান হবে সেই দিন, যেদিন একটি কিশোর অস্ত্রের বদলে বই হাতে নেবে, অপরাধীর সঙ্গে নয়—বন্ধু হবে খেলাধুলার মাঠের, আর ভয় দেখানোর বদলে স্বপ্ন দেখবে।

কৈশোরকে বাঁচান।
কারণ আজকের কিশোরই আগামী দিনের বাংলাদেশ।

আল আমিন

আল আমিন

প্রকাশক ও সম্পাদক
লেখকের সকল মতামত ও লেখা পড়ুন →
০%
০%
০%
০%