২০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে নির্মিত চিলাহাটি স্থলবন্দর এখন পরিত্যক্ত ও অচল

নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার চিলাহাটি সীমান্তে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন স্থলবন্দর ও অবকাঠামো এখন কেবলই এক পরিত্যক্ত জনপদ। ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিক রেলপথ পুনর্সঞ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু হলেও, গত আগস্ট মাসে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাব দেখিয়ে বন্দরটির কার্যক্রম আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল অর্থ ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক স্টেশন ভবন, ভিআইপি অতিথিশালা, ওভারব্রিজ ও কাস্টমস অবকাঠামো এখন ধুলোবালি আর মরিচায় জরাজীর্ণ হয়ে পড়ে আছে।
২০২১ সালে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের মধ্য দিয়ে এই রুটটি পুনরায় সক্রিয় হয় এবং পরবর্তীতে মিতালি এক্সপ্রেস চালুর মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ যাত্রী পরিবহনের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়। তবে ১২৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত মূল অবকাঠামো এবং আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ প্রায় ২০০ কোটি টাকার এই প্রকল্পের সুফল দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও ভারত থেকে পাথর আমদানিতে ধীরগতির ফলে ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকেই কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে। পরিশেষে, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে সরকারি প্রজ্ঞাপনে স্থলবন্দরটি বন্ধের নির্দেশ আসায় স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের স্বপ্ন মুখ থুবড়ে পড়েছে।
চিলাহাটি স্টেশনের আর্থিক তথ্যে দেখা যায়, পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ হওয়ায় রেলওয়ের আয়ে ধস নেমেছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে যে স্টেশনের মাসিক আয় ছিল প্রায় ৮০ লাখ টাকা, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে তা ৩৫ লাখ টাকায় নেমে এসেছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ রুটের ট্রেন ছাড়া পুরো স্টেশনের কর্মতৎপরতা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মহীন অলস সময় পার করছেন এবং বন্দরের সঙ্গে জড়িত হাজারো শ্রমিক ও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টরা আজ দিশেহারা।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও চেম্বার অব কমার্সের নেতারা জানান, চিলাহাটি স্থলবন্দরটি ভারত, নেপাল, ভুটান ও চীনের সঙ্গে আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্দরটি চালু থাকলে পরিবহন খরচ অনেকাংশে কমে আসত, যা উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখত। বর্তমানে পাথরসহ অন্যান্য পণ্য পঞ্চগড় হয়ে বাড়তি খরচে আনতে হচ্ছে, যা সামগ্রিক ব্যবসায়িক ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান জানিয়েছেন, বন্দরটি পুনরায় সচল করার বিষয়টি বর্তমানে উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, দুই দেশের পারস্পরিক সম্মতি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ ছাড়া আপাতত এই বন্দর চালুর কোনো সম্ভাবনা নেই। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই অবকাঠামো এখন দেশের বাণিজ্যিক লোকসানের এক প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
