অবকাঠামোগত সংকটে স্থবির ভোমরা স্থলবন্দর রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বড় অনিশ্চয়তা

সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দরে দীর্ঘ সময় ধরে নেমে এসেছে গভীর স্থবিরতা। অবকাঠামোগত সংকট এবং ব্যবসায়িক প্রতিকূলতার কারণে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রবেশদ্বারে পণ্যবাহী ট্রাকের চলাচল আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বাণিজ্যের এই মন্দা সরাসরি প্রভাব ফেলছে স্থানীয় শ্রমবাজার ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর, যার ফলে হাজার হাজার শ্রমিক ও ব্যবসায়ীরা চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
গত ৯ আগস্ট সরেজমিনে ভোমরা বন্দরে গিয়ে দেখা যায়, কর্মচাঞ্চল্যের চিরাচরিত রূপটি ম্লান হয়ে গেছে। হ্যান্ডলিং শ্রমিকদের দীর্ঘ সারি কাজের অপেক্ষায় অলস সময় পার করছেন। আজিজুল ইসলামের মতো অনেক শ্রমিক জানিয়েছেন, বাণিজ্যের পরিমাণ কমে যাওয়ায় দৈনিক মজুরি ও কাজের সুযোগ উভয়ই তলানিতে ঠেকেছে। এর ফলে অনেক শ্রমিক জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র পাড়ি জমাচ্ছেন, যা স্থানীয় জনপদকে এক গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
বাণিজ্যিক এই ধসের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের পরিসংখ্যানেও। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভোমরা বন্দরের জন্য ২ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও, জুলাই মাসে মাত্র ৯৮ কোটি টাকা আদায় হয়েছে। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক পূরণ করাও অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর আগে গত অর্থবছরে ২ হাজার ৬৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আদায় হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ১১৪ কোটি টাকা, যেখানে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৯৫১ কোটি টাকা।
আমদানি-রপ্তানির সামগ্রিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাণিজ্যে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই বন্দর দিয়ে ২০ লাখ ৮২ হাজার ৭২২ টন পণ্য আমদানি হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১৯ লাখ ৭৩ হাজার ৪৭ টনে নেমেছে। রপ্তানির চিত্রটি আরও হতাশাজনক; আগের বছরের তুলনায় রপ্তানি আয় ১ হাজার ৫১৪ কোটি টাকা কমে ১ হাজার ৮৯২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এক বছরের ব্যবধানে রপ্তানি কমেছে ১০ লাখ ২৫ হাজার ৯০১ টন।
ভোমরা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আবু মুসার ভাষ্যমতে, বন্দরের ব্যবসায়িক কার্যক্রম অর্ধেকে নেমে আসায় বহু কর্মী বেকার হয়ে পড়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, সব ধরনের পণ্য আমদানির সুযোগ থাকলেও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাব আমদানিকারকদের নিরুৎসাহিত করছে। সাতক্ষীরা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি নাসিম ফারুক খান যোগ করেন যে, ভারী ক্রেন, পর্যাপ্ত ইয়ার্ড ও আধুনিক গুদাম সুবিধার অভাব এই স্থলবন্দরের সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
ওপার সীমান্তে ভারতের ঘোজাডাঙা বন্দরের তুলনায় ভৌগোলিক সুবিধা থাকা সত্ত্বেও ভোমরা বন্দর পিছিয়ে পড়ার পেছনে ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাকে দায়ী করছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। অবশ্য পরিস্থিতি উত্তরণে আশার বাণী শুনিয়েছেন ভোমরা কাস্টম হাউসের কমিশনার মুশফিকুর রহমান। তিনি জানিয়েছেন, ব্যবসায়ীদের সেবার মান উন্নয়ন, হয়রানি হ্রাস এবং দ্রুত পণ্য খালাস নিশ্চিত করতে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ সক্রিয় রয়েছে এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক সমস্যাগুলো সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
