ওমান উপকূলে তেলবাহী জাহাজের ভয়াবহ বিপর্যয় ১,৩০০ বর্গকিলোমিটারে ছড়িয়ে পড়া তেল অপসারণে আন্তর্জাতিক তৎপরতা

ওমান উপকূলে তেলবাহী একটি বিকল ট্যাঙ্কার থেকে সৃষ্ট রেকর্ড পরিমাণ তেল নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে অবশেষে একটি আন্তর্জাতিক উদ্ধার তৎপরতা শুরু হয়েছে। রাশিয়ার ওপর আরোপিত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল পরিবহনে ব্যবহৃত সন্দেহভাজন এক ‘ছায়া বহরের’ অন্তর্ভুক্ত ‘ক্যারোলিন বেজেঙ্গি’ নামের এই ট্যাঙ্কারটি থেকে নিঃসরিত তেল ওমানের মধ্য উপকূলবর্তী সমুদ্রসৈকতে ছড়িয়ে পড়েছে। পরিবেশবাদী সংস্থা গ্রিনপিস সতর্ক করে জানিয়েছে, এই তেল বিপর্যয়টি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়ে প্রায় ১,৩০০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে, যা স্থানীয় সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে।
যুক্তরাজ্যের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রতিষ্ঠান অ্যাম্ব্রি জানিয়েছে, তারা ওমানি কর্তৃপক্ষের সাথে যৌথভাবে একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কর্মসূচির অংশ হিসেবে কাজ করছে। এই উদ্ধার কার্যক্রমে বিশেষায়িত উদ্ধারকারী জাহাজ, উড়োজাহাজ এবং বিশেষজ্ঞ দল মোাতেয়েন করা হয়েছে। তবে বার্ষিক খারিফ মৌসুমী বায়ুর বৈরী আবহাওয়ার কারণে উদ্ধার অভিযান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন অ্যাম্ব্রির গ্লোবাল রেসপন্স ডিরেক্টর এড ওলাস্টন। তিনি উল্লেখ করেন, পরিবেশগত ক্ষতি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে তাদের উদ্ধারকারী দল চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করে যাচ্ছে।
তৈলবাহী জাহাজটির জটিল মালিকানা এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর কৌশল এই উদ্ধার অভিযান ও ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে। জাতিসংঘ অনুমোদিত আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করার কথা জানালেও, ইন্টারন্যাশনাল অয়েল পলিউশন কমপেনসেশন ফান্ডস এই ঘটনার পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে যুক্ত হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সংস্থাটির মতে, প্রাথমিক তদন্তে এই দুর্ঘটনাটি একটি যুদ্ধকালীন কর্মকাণ্ডের ফল বলে প্রতীয়মান হওয়ায় আন্তর্জাতিক ক্ষতিপূরণ নীতিমালার আওতায় তারা এর কোনো দায়ভার নেবে না।
উপগ্রহ চিত্রের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে এই তেল নিঃসরণের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রিনপিসের তথ্য অনুযায়ী, গত জুলাই মাসের শেষের দিকে যেখানে দূষণের পরিমাণ ছিল মাত্র ৪৫ বর্গকিলোমিটার, তা চলতি সপ্তাহের বুধবার নাগাদ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ১,৩০০ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। যদিও ওমানি কর্তৃপক্ষ গত সোমবার এই দূষণের পরিমাণ প্রায় ৪০০ বর্গকিলোমিটার বলে প্রাক্কলন করেছিল, কিন্তু প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বহুগুণ বেশি বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ওমান সরকারের পক্ষে এই জটিল বাণিজ্যিক ও পরিবেশগত সংকট একা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল, কারণ জাহাজটির কোনো বৈধ মালিক বা যাচাইকৃত বীমাকারী নেই। ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক নাজমেদিন মেশকাতি জানান, দুর্ঘটনার পর প্রাথমিক দুই মাসের যে মহামূল্যবান সময়সীমা ছিল, তা সঠিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। দুর্ঘটনার প্রথম তিন দিনের উদ্ধার তৎপরতা যতটা ফলপ্রসূ হয়, ৬০ দিন পর তা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে এবং এর ফলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি অবধারিত হয়ে ওঠে।
কাতারভিত্তিক হামাদ বিন খলিফা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি ও পরিবেশ আইন বিষয়ের অধ্যাপক দামিলোলা এস ওলাউয়ি এই সংকটের আইনি ও বাণিজ্যিক দিকটি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী যে পক্ষ দূষণের জন্য দায়ী, তাদেরকেই ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ব্যয়ভার বহন করতে হবে। তবে বর্তমান বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের যুগে প্রকৃত দায়ী পক্ষকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র বাণিজ্যের ঝুঁকি ও পরিবেশগত ব্যবস্থাপনাকে এক অভূতপূর্ব সংকটে ফেলেছে।
