Advertisement

বলিউডের ঝকমকে পর্দার আড়ালে পাপারাজ্জি সংস্কৃতির অজানা হিসাব ও ব্যবসার অন্দরমহল

মুম্বাইয়ের ব্যস্ত রাস্তায় কোনো তারকার জিম থেকে বেরোনোর মুহূর্তটি সাধারণ দর্শকের কাছে মাত্র দশ সেকেন্ডের এক ঝলক। হাতে কফির কাপ, পরনে ক্যাজুয়াল পোশাক—ক্যামেরার সামনে একবার তাকিয়ে হালকা হাসিতেই শেষ সেই দৃশ্য। কিন্তু এই ১০ সেকেন্ডের ভিডিওটি পর্দায় তুলে আনতে একজন পাপারাজ্জির পরিশ্রমের গল্পটা মোটেও অতোটা সাধারণ নয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে জিমের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, মোটরসাইকেলে মুম্বাইয়ের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছোটা কিংবা কোনো তারকার বাড়ির সামনে রাত কাটানোর মতো শ্বাসরুদ্ধকর অভিজ্ঞতাই এখনকার পাপারাজ্জি সংস্কৃতির মূল ভিত্তি।

ইনস্টাগ্রাম ও শর্ট ভিডিওর এই যুগে পাপারাজ্জিদের কাজের ধরন আমূল বদলে গেছে। একসময়ের প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের ছবির বদলে এখন এটি পরিণত হয়েছে দ্রুতগতির কনটেন্ট ব্যবসায়। তিন সেকেন্ডের একটি ভিডিও ক্লিপ মুহূর্তেই লাখো মানুষের স্ক্রলে জায়গা করে নেয়। বিমানবন্দরে তারকার পোশাক কিংবা জিম থেকে বের হওয়ার প্রতিটি দৃশ্যই এখন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মিলিয়ন ভিউয়ের একেকটি খনি। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই স্বতঃস্ফূর্ততায় ঘেরা জগতটির পেছনে কাজ করে নিখুঁত এক নেটওয়ার্ক। পিআর টিমের ফোন কল থেকে শুরু করে নির্দিষ্ট লোকেশন, ব্র্যান্ড প্রমোশন, চলচ্চিত্রের বিপণন এবং তারকা ও ফটোগ্রাফারদের মধ্যে থাকা অলিখিত বোঝাপড়া—সব মিলিয়ে এটি এখন সুবিন্যস্ত এক অর্থনৈতিক কাঠামো।

বিজ্ঞাপন

পাপারাজ্জিদের কাজের পরিধি এখন অনেক বিস্তৃত। বিশাল নামের এক অভিজ্ঞ ফটোগ্রাফারের কথায় উঠে আসে, তারকাদের ওপর নজর রাখা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। বিশালের মতো পেশাদাররা একেকটি এলাকায় নিজস্ব ‘বিট’ মেনে কাজ করেন। কোন তারকা কোন জিমে যান, কোন গাড়িতে চলেন—এসব খুঁটিনাটি তথ্য তাঁদের নখদর্পণে। এখনকার দিনে ফোর-কে ক্যামেরায় ক্লোজআপ ফুটেজের চাহিদাও তুঙ্গে, যদিও অতিরিক্ত জুমের কারণে অনেক তারকা প্রায়ই বিরক্ত প্রকাশ করেন। তবুও এই ‘তিন থেকে পাঁচ সেকেন্ডের খেলা’য় সেরা শটটি ধরতে না পারলে পুরো দিনের অপেক্ষা বৃথা যায়।

মজার ব্যাপার হলো, সব সময় বড় তারকারাই ভিউ এনে দেন না। রিয়েলিটি শোয়ের প্রতিযোগীদের জনপ্রিয়তাও অনেক সময় আলিয়া ভাট কিংবা বড় তারকাদের ছাড়িয়ে যায়। এই ব্যবসার আয়ের উৎস কেবল সাধারণ ছবি নয়; বরং ধর্মা প্রোডাকশনস বা টি-সিরিজের মতো বড় প্রোডাকশন হাউসের চলচ্চিত্রের প্রচার, ব্র্যান্ড এনগেজমেন্ট এবং ইনস্টাগ্রাম মার্কেটিং থেকে আসে মূল অর্থ। তবে এই ঝলমলে জগতের আড়ালে থাকা ফটোগ্রাফারদের মাসিক আয় সাধারণত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার রুপির মধ্যেই সীমাবদ্ধ, যা তাঁদের অমানুষিক পরিশ্রমের তুলনায় খুবই সামান্য।

বিজ্ঞাপন

পাপারাজ্জি ও তারকাদের সম্পর্কের সমীকরণটিও বড়ই অদ্ভুত। রণবীর কাপুর বা সোনাক্ষী সিনহার মতো তারকারা যেমন মাঝে মাঝে ফটোগ্রাফারদের প্রতি বন্ধুসুলভ আচরণ করেন, আবার জয়া বচ্চনের মতো ব্যক্তিত্বরা কড়া ভাষায় আপত্তি জানান। কিছু তারকা ব্যক্তিগত গোপনীয়তার খাতিরে সন্তানদের ছবি তুলতে নিষেধ করেন, যা পেশাদার ফটোগ্রাফাররা অনেক ক্ষেত্রেই সম্মান করেন। কখনো কখনো ফটোগ্রাফাররা নিজেরাই কোনো শিশুকে ক্যামেরায় পেয়ে গেলে এডিট করে তা বাদ দিয়ে দেন, যাতে কোনো বড় আইনি জটিলতা বা ঝামেলার সৃষ্টি না হয়।

পরিশেষে, তারকাদের ঘিরে এই যে পাগলামি, তা কেবল গ্ল্যামারের অংশ নয়; বরং এটি এখন দর্শকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। দর্শক এখন শুধু রূপালি পর্দায় তারকাদের দেখতে চান না, বরং বাস্তব জীবনে তাঁরা কী করছেন, কী পরছেন, সেই প্রতিটি মুহূর্তের ডিজিটাল রেকর্ডেও চোখ রাখতে চান। দর্শকই ঠিক করে দেয় কোন গল্পটি ভাইরাল হবে, আর এই চাহিদাকে পুঁজি করেই আজকের বলিউড পাপারাজ্জিরা গড়ে তুলেছেন এক অভিনব বিনোদন অর্থনীতি—যেখানে পিআর টিম, ক্যামেরা, আর লেন্সের মাঝে প্রতিদিন নতুন কোনো গল্পের জন্ম হয়।

0%
0%
0%
0%