যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান নেতানিয়াহুর গাজায় সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার শঙ্কা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে প্রণীত গাজা শান্তি প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তার এই অনড় অবস্থান যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলটিতে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কাকে ঘনীভূত করেছে এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে কার্যত স্থবির করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্ত কেবল শান্তি প্রক্রিয়াই ব্যাহত করেনি, বরং গাজার বিশ লক্ষাধিক ফিলিস্তিনির মানবিক বিপর্যয়কে চরম আকার ধারণের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় তৈরি ১৫ দফার এই শান্তি পরিকল্পনায় হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং পর্যায়ক্রমে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের শর্ত ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার শাসনভার একটি প্রযুক্তিবিদ বা টেকনোক্র্যাট কমিটির হাতে ন্যস্ত করার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনীর তত্ত্বাবধানের প্রস্তাব করা হয়েছিল। তবে নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে নেতানিয়াহু সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, হামাস সম্পূর্ণভাবে নিরস্ত্রীকরণ না হওয়া পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনারা গাজা থেকে সরবে না।
গাজার সরকারি মিডিয়া অফিস নেতানিয়াহুর এই ঘোষণাকে শান্তি আলোচনার বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ইসরায়েল শান্তি আলোচনাকে কেবল সময়ক্ষেপণ এবং যুদ্ধের নতুন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে। এদিকে, গাজায় অবস্থানরত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইয়াদ আল-কাররা সতর্ক করে বলেছেন, নেতানিয়াহুর এই অবস্থানের ফলে নতুন করে বিমান হামলা ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বাড়ছে, যা ইতিমধ্যে জনমনে চরম ভীতি তৈরি করেছে।
আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে মিশরের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর আবদেলআত্তি এই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, ফিলিস্তিনিদের গাজা থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার যে চেষ্টা ইসরায়েল চালাচ্ছে, তা মিশরীয়সহ আরব বিশ্বের জন্য একটি ‘রেড লাইন’ বা অলঙ্ঘনীয় সীমানা। আবদেলআত্তি অভিযোগ করেন, ইসরায়েল ইচ্ছাকৃতভাবে গাজায় প্রতিদিন ৬০০ ট্রাক ত্রাণ সহায়তা প্রবেশের ন্যূনতম শর্ত পূরণ করছে না, যা পরিস্থিতিকে আরও শোচনীয় করে তুলছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাহজুব জুয়েইরি মনে করেন, নিরস্ত্রীকরণের শর্তটি নেতানিয়াহুর একটি সুপরিকল্পিত কৌশল, যাতে শান্তি প্রক্রিয়া কখনোই আলোর মুখ না দেখে। তার মতে, নেতানিয়াহুর মূল উদ্দেশ্য হলো গাজাকে এমন একটি জনশূন্য ও বসবাসের অযোগ্য এলাকায় পরিণত করা, যেখানে ফিলিস্তিনিদের কোনো নিয়ন্ত্রণ বা অস্তিত্ব অবশিষ্ট থাকবে না। একইসঙ্গে, আসন্ন নির্বাচনে নিজ রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহু মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে নিজের কট্টরপন্থী ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছেন বলে ধারণা করছেন পর্যবেক্ষকরা।
তবে এই সংকটের মুখে হামাস এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা মার্কিন নেতৃত্বাধীন শান্তি ও আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষাকারী বোর্ডের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একই সঙ্গে তারা মধ্যস্থতাকারীদের ইসরায়েলের এই চরম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। বর্তমান কূটনৈতিক অচলাবস্থা কেবল গাজার ভবিষ্যতের ওপরই নয়, বরং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কেও বড় ধরনের ভাঙন ধরাতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
