ডোম্বিভলির লোকাল ট্রেন থেকে মেলবোর্নের ঐতিহাসিক জয় এক অদম্য অজিঙ্ক রাহানের বর্ণিল ক্রিকেট উপাখ্যান

মুম্বাইয়ের শহরতলি ডম্বিভলি থেকে আজাদ ময়দান—প্রতিদিন প্রায় ৫০ কিলোমিটারের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতেন অজিঙ্কা রাহানে। লোকাল ট্রেনের ঠাসাঠাসি ভিড়ে ৮০ মিনিটের ক্লান্তি আর দীর্ঘ যাত্রা শেষে সকাল সাড়ে ৯টার ম্যাচে মাঠে নামার তাগিদই ছিল তাঁর প্রতিদিনের রুটিন। দুই টিফিন বক্সে খাবার নিয়ে দীর্ঘ অনুশীলনে ডুবে থাকা রাহানের মধ্যে সেই কৈশোর থেকেই লক্ষ্য অর্জনের প্রবল জেদ আর নিষ্ঠা ছিল স্পষ্ট। ডম্বিভলির এসভি জোশি হাই স্কুলের সেই কিশোর যে একদিন ভারতীয় ক্রিকেটের বরপুত্র হয়ে উঠবেন, তা হয়তো প্রথম আঁচ করেছিলেন প্রাক্তন স্পিনার নীলেশ কুলকার্নি। তাঁর দৃষ্টিতে রাহানে ছিলেন একাধারে বিনয়ী, কঠোর পরিশ্রমী এবং শিখতে আগ্রহী এক অনন্য প্রতিভা।
রাহানের ক্যারিয়ারের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে লড়াই আর ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সে পায়ে গুরুতর আঘাত নিয়েও দলের প্রয়োজনে সাত নম্বরে ব্যাট করতে নেমে ৩৫ রান করে ম্যাচ জেতানোই তাঁর অদম্য মানসিকতার পরিচয় দেয়। কোচ রাজু পাঠকের তত্ত্বাবধানে বড় হওয়া রাহানে শুধু ব্যাটিংয়েই নয়, ফিল্ডিংয়েও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। ক্যারাটে ব্ল্যাক বেল্টধারী এই ক্রিকেটারের হাতের পেশি শক্ত থাকার কারণে শুরুতে ক্যাচ ধরতে সমস্যা হলেও, নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে তিনি হয়ে ওঠেন বিশ্বমানের ফিল্ডার। বর্তমানে ৮৫ টেস্টে ১০২টি ক্যাচ নিয়ে তিনি ভারতের অন্যতম সেরা ফিল্ডারদের একজন।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ১৯৫ ম্যাচে ৮০০০-এর বেশি রান, ১৫টি সেঞ্চুরি আর ৫১টি হাফ সেঞ্চুরি—সংখ্যার বিচারে রাহানের সমৃদ্ধ ক্যারিয়ারের একটি প্রতিচ্ছবি মাত্র। তবে পরিসংখ্যানের চেয়েও তাঁর ব্যাটিংয়ের তেজ বেশি অনুভূত হয়েছে প্রতিকূল কন্ডিশনে। ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার পেস-বান্ধব পিচে রাহানের ব্যাট থেকে আসা ইনিংসগুলো আজও ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। বিশেষ করে ২০১৮ সালে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে কঠিন পিচে তাঁর ৪৮ রানের ইনিংস কিংবা ২০২০ সালে মেলবোর্ন টেস্টে বক্সিং ডে-তে অজিদের বিপক্ষে ১১৩ রানের সেই মহাকাব্যিক সেঞ্চুরি ভারতীয় ক্রিকেটের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
অধিনায়ক হিসেবে রাহানে ছিলেন বোলারদের নির্ভরতার প্রতীক। ২০২০-২১ অস্ট্রেলিয়া সফরে ইনজুরি জর্জরিত দলকে নেতৃত্ব দিয়ে সিরিজ জেতানো তাঁর ক্যারিয়ারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অর্জন। মাঠে অহেতুক চাপ না রেখে সতীর্থদের ওপর আস্থা রাখাই ছিল তাঁর নেতৃত্বের মূল দর্শন। জাসপ্রিত বুমরাহ কিংবা রবিচন্দ্রন অশ্বিনের মতো বোলারদের ওপর ভরসা রেখে তিনি যেভাবে মাঠ পরিচালনা করতেন, তা তাঁকে সতীর্থদের কাছে এক সম্মানের জায়গায় নিয়ে গেছে। প্রাক্তন ফিল্ডিং কোচ আর শ্রীধরের ভাষায়, রাহানে এমন একজন নেতা যিনি নিজে সামনে থেকে লড়েন কিন্তু কৃতিত্ব দেওয়ার সময় সবসময় নিজেকে আড়ালে রাখেন।
প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ১৪০০০-এর বেশি রান করা রাহানে মুম্বাই ক্রিকেটের প্রতি ছিলেন আজীবন নিবেদিত। ভারতীয় দলে ফেরার সুযোগ ক্ষীণ জেনেও ২০২৪-২৫ মৌসুমে মুম্বাইয়ের হয়ে রঞ্জি ট্রফি জয় এবং পুরো মৌসুম খেলে যাওয়া তাঁর পেশাদারিত্বের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। প্রবীণ কোচ প্রবীণ আমরের মতে, টেস্ট ক্রিকেটের প্রকৃত সৌন্দর্য যারা বোঝেন, রাহানের ব্যাটিং তাদের জন্য এক শিক্ষা। ক্রিকেট মাঠ থেকেই বিদায় নেওয়ার যোগ্য এই লড়াকু সৈনিক দীর্ঘ ক্যারিয়ারে যে ধৈর্য, নিষ্ঠা আর নম্রতার স্বাক্ষর রেখে গেছেন, তা আগামী প্রজন্মের ক্রিকেটারদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।
