সৌদি আরবের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু চুক্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতার আশঙ্কা

মধ্যপ্রাচ্যে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ক্রমবর্ধমান আশঙ্কার মধ্যেই সৌদি আরবের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদি এক যুগান্তকারী পারমাণবিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার স্বাক্ষরিত এই চুক্তির আওতায় ওয়াশিংটন সৌদি আরবকে পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে এই পদক্ষেপ আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে বড় ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করতে পারে বলে বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন।
চুক্তিটির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলী এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। তবে সৌদি আরবের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা অর্জনের সম্ভাবনা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির প্রাথমিক ধাপ হিসেবে বিবেচিত হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা দাবি করছেন যে, এই প্রযুক্তি কেবল বেসামরিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাজেই ব্যবহৃত হবে, তবুও সমালোচকরা একে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন।
এই চুক্তি এখন পর্যালোচনার জন্য মার্কিন কংগ্রেসে উত্থাপন করা হয়েছে। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে বিরোধিতার সম্ভাবনা থাকলেও চুক্তিটি শেষ পর্যন্ত পাস হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এদিকে, ইসরায়েলের সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী আভিগডোর লিবারম্যান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় এ চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তার মতে, সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকেই গড়াবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে এক ভয়াবহ অস্ত্র প্রতিযোগিতার সূচনা করবে।
সৌদি আরবের ডি-ফ্যাক্টো নেতা মোহাম্মদ বিন সালমান ২০১৮ সালে সিবিএস নিউজকে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করলে সৌদি আরবও তা করতে দ্বিধা করবে না। অন্যদিকে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও দাবি করেছেন, এই প্রকল্পে মার্কিন ঠিকাদাররা যুক্ত থাকায় ওয়াশিংটন নিয়মিত তদারকি করতে পারবে, ফলে পারমাণবিক বিস্তার রোধ সম্ভব হবে। ধারণা করা হচ্ছে, মার্কিন পারমাণবিক চুল্লি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টিংহাউস এই প্রকল্পের প্রধান ঠিকাদার হিসেবে কাজ করবে।
মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে। অতীতে ইরানের বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের বারাকাহ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের চারপাশে সামরিক হামলার ঘটনা ঘটেছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো চুল্লির কেন্দ্রস্থলে আঘাতের ফলে যে তেজস্ক্রিয় গ্যাস ছড়িয়ে পড়বে, তা ২০ থেকে ৩০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। জাপানের ফুকুশিমা কিংবা ইউক্রেনের চেরনোবিল দুর্ঘটনার স্মৃতি এখনো বিশ্ববাসীর জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে রয়ে গেছে।
চুক্তির অন্যতম বিতর্কিত দিক হলো সৌদি আরবে একটি ‘ব্ল্যাক বক্স’ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র স্থাপনের প্রস্তাব। আটলান্টিক কাউন্সিলের ফেলো ম্যাথু ক্রোনিগ আল-জাজিরাকে বলেছেন, বিশ্বের কোথাও এ ধরনের ব্যবস্থা নেই। তার আশঙ্কা, সৌদি প্রকৌশলীরা প্রযুক্তি আয়ত্ত করার পর ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রকল্প থেকে সরিয়ে দিতে পারে। যদিও অনেকে মনে করছেন, দুই বছর মেয়াদি এই যৌথ গবেষণা আসলে যুক্তরাষ্ট্রের একটি কৌশলগত পদক্ষেপ হতে পারে, যাতে সৌদি আরবকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ থেকে বিরত রাখা যায়।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা