গ্যাস সংকটে ধুঁকছে কুমিল্লার ঐতিহ্যবাহী বিজয়পুর মৃৎশিল্প

কুমিল্লা সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর এলাকায় অবস্থিত রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে। ১৯৬১ সালে মাত্র ১৫ জন সদস্য এবং ২২ টাকা ৫০ পয়সা মূলধন নিয়ে প্রগতি সংঘ নামে এই শিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে সমবায় আন্দোলনের পথিকৃৎ ও আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সমাজবিজ্ঞানী ড. আখতার হামিদ খানের উদ্যোগে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বিজয়পুর রুদ্রপাল মৃৎশিল্প সমবায় সমিতি।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হলেও ১৯৭২ সালে সরকারি ৭৫ হাজার টাকার প্রণোদনা সহায়তায় সমিতিটি পুনরায় ঘুরে দাঁড়ায়। বর্তমানে কুমিল্লার এই অঞ্চলের তেগুরিয়াপাড়া, গাঙকুল, দক্ষিণ বিজয়পুর, উত্তর বিজয়পুর, বারপাড়া, দুর্গাপুর ও নোয়াপাড়া গ্রামের দেড় শতাধিক পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে অন্তত ৫০টি পরিবার সরাসরি এই সমিতির অধীনে কাজ করছেন এবং বর্তমানে সমিতির স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের মূল্য প্রায় ১০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
সমিতিটি ১৯৯১ সালে গ্যাস সংযোগ পেলেও ২০১৫ সাল থেকে গ্যাসের চাপ কমতে শুরু করে এবং ২০১৭ সাল থেকে তা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। নিরবচ্ছিন্ন গ্যাসের অভাবে বর্তমানে কুমারদের বাধ্য হয়ে লাকড়ি, খড় ও কাগজের মতো সনাতন পদ্ধতিতে মাটি পোড়াতে হচ্ছে। এতে পণ্যের মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং অতিরিক্ত শ্রমিকের প্রয়োজন হওয়ায় উৎপাদন খরচ বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা মাসিক মাত্র ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা পারিশ্রমিক পাচ্ছেন, যা বর্তমান সময়ে একটি পরিবারের জীবিকা নির্বাহের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল।
কুমিল্লা-নোয়াখালী আঞ্চলিক মহাসড়ক সংলগ্ন বিজয়পুরে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে মাটির হাঁড়ি-পাতিল, ফুলদানি, দধির বাটি, মগ-জগসহ নান্দনিক সব পণ্য তৈরির কর্মযজ্ঞ। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সমান তালে কাজ করে যাচ্ছেন। এখানে টেরাকোটা শোপিস থেকে শুরু করে মনীষী ও পশু-পাখির প্রতিকৃতি এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত মডেল তৈরি করা হচ্ছে। হাতে গোনা একজন শিল্পী টেরাকোটার জটিল কাজগুলো করছেন, যার প্রতিটি স্কয়ার ফুটের মূল্য ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা।
প্লাস্টিক ও অ্যালুমিনিয়ামের পণ্যের ভিড়েও এখানকার তৈরি মৃৎশিল্প দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানি হচ্ছে। বিলুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্য ও স্থানীয় মৃৎশিল্পীদের জীবিকার মান উন্নয়নে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।