চরম খরায় বিপর্যস্ত ব্রিটেনের কৃষি খাত অনিশ্চয়তার মুখে কৃষক

রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের ঘাটতি এবং অস্বাভাবিক উচ্চ তাপমাত্রার কবলে পড়ে চরম সংকটের মুখে পড়েছে যুক্তরাজ্যের কৃষিখাত। ক্যামব্রিজশায়ারের ক্যাক্সটন এলাকার ম্যানর ফার্মের মালিক টম পিয়ারসন নিজের খামারের বুক চেরা ফাটলগুলো দেখিয়ে বলেন, জলবায়ুর এই চরম প্রতিকূলতার সামনে টিকে থাকা এখন কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশটির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জমি বর্তমানে খরার কবলে রয়েছে, যা ১৮৩৬ সালের পর থেকে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে জুলাই মাসের সবচেয়ে শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
ন্যাশনাল ফার্মার্স ইউনিয়নের কম্বিনেবল ক্রপস বোর্ডের চেয়ারম্যান জেমি বারোস জানিয়েছেন, অনেক অঞ্চলে গড়ের তুলনায় মাত্র দশ ভাগের এক ভাগ বৃষ্টিপাত হয়েছে। চলতি বছরের জুলাই মাস শেষ হওয়ার আগেই শীতকালীন গমের অর্ধেকের বেশি ফসল ঘরে তোলা হয়েছে, যা কৃষি উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। হেলেন ওয়েকহামের নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল ড্রট গ্রুপ এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব বিস্তারকারী বলে অভিহিত করেছে।
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া পৈতৃক জমিতে পিয়ারসন রি জেনারেটিভ বা পুনর্জন্মমূলক কৃষি পদ্ধতি প্রয়োগ করছেন। তিনি কোনো রকম চাষাবাদ ছাড়াই ফসল ফলানোর পাশাপাশি রাসায়নিক সারের ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমিয়ে এনেছেন। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র, পোল্যান্ড ও চেক প্রজাতন্ত্রের বীজ ব্যাংক থেকে সংগ্রহ করা খরা সহনশীল প্রাচীন জাতের গম চাষ করছেন তিনি, যা মূলত ১০ হাজার বছর আগে উর্বর অর্দ্ধচন্দ্রাকৃতি অঞ্চলে উদ্ভাবিত হয়েছিল।
এতসব সতর্কতা ও আধুনিক পদ্ধতির প্রয়োগ সত্ত্বেও গত তিন বছর ধরে পিয়ারসনের উৎপাদনে বড় ধরনের ধস নেমেছে। জ্বালানি ও সারের আকাশচুম্বী দাম এবং দীর্ঘস্থায়ী খরার দ্বিমুখী আক্রমণে কৃষকরা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। পিয়ারসনের মতে, প্রকৃতির বৈরী আচরণের কাছে মানুষের নেওয়া সব কৌশলই যেন নস্যি হয়ে পড়ছে, যেখানে মাটির স্বাস্থ্যরক্ষার চেষ্টাও অনেক সময় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে।
ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ইউরোপীয় কমিশনের মে মাসের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউরোপজুড়ে চরম আবহাওয়ার কারণে কৃষিখাতে বছরে ২৮ বিলিয়ন ইউরো বা ৩২.২৮ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হচ্ছে, যা ২০৫০ সালের মধ্যে ১০০ বিলিয়ন ইউরো বা ১১৫.২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোতে কৃষকদের জন্য কোনো সমন্বিত শস্য বীমা ব্যবস্থা না থাকায় এই বিশাল আর্থিক ঝুঁকির দায়ভার সরাসরি তাদের ওপরই বর্তাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় সরকারের উচিত খরা সহনশীল জাত উদ্ভাবন এবং খামারে পানি সংরক্ষণের আধুনিক প্রযুক্তিগত কাঠামো গড়ে তোলা। পিয়ারসন মনে করেন, কৃষকদের শুধুমাত্র ভর্তুকি দিলেই চলবে না, বরং মাঠপর্যায়ে তথ্য ও গবেষণার বিস্তার ঘটিয়ে পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করতে হবে। শহরের নিকটবর্তী খামারগুলোকে সরাসরি ভোক্তাদের সাথে যুক্ত করার মাধ্যমে এই প্রতিকূলতা কিছুটা হলেও কাটিয়ে ওঠার স্বপ্ন দেখছেন তিনি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
