AdvertisementAdvertisement

ড্রোন সক্ষমতার ব্যবধান মেটাতে লন্ডনের গোপন বাঙ্কারে ন্যাটোর যুদ্ধ মহড়া

লন্ডনের ভূগর্ভস্থ চ্যারিং ক্রস স্টেশনের পরিত্যক্ত জুবিলি লাইনের গভীরে ন্যাটোর একটি গোপন কমান্ড বাঙ্কার এ সপ্তাহে নিভৃতে কর্মমুখর হয়ে উঠেছে। উপর দিয়ে চলাচলকারী হাজার হাজার যাত্রী ও পর্যটকদের অগোচরে, এই বাঙ্কারে ২০৩০ সালে এস্তোনিয়ায় সম্ভাব্য রুশ আগ্রাসন প্রতিহত করার এক জটিল সামরিক মহড়ায় ডজনখানেক ব্রিটিশ সেনা অংশ নিচ্ছেন। এই মহড়ার মূল লক্ষ্য কেবল মস্কোকে ন্যাটোর প্রস্তুতি সম্পর্কে বার্তা দেওয়া নয়, বরং ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির জন্য অভ্যন্তরীণভাবে চাপ সৃষ্টি করাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য।

সাধারণত তালাবদ্ধ থাকা দুটি ধাতব ডবল দরজার আড়ালে লুকিয়ে আছে এই গোপন কক্ষগুলি। ভেতরের এস্কেলেটরের তলদেশে একটি লালচে আভা নিচের সৈন্যদের প্রথম চিহ্ন দেয়। এর পরেই চোখে পড়ে পুরনো বিজ্ঞাপনের ওপর সাঁটানো নকল পত্রিকার শিরোনাম, যা জানান দিচ্ছে যে রুশ সৈন্য সমাবেশের জবাবে ব্রিটিশ ন্যাটো বাহিনী এস্তোনিয়ায় মোতায়েন হয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

অ্যালাইড র‍্যাপিড রিয়্যাকশন কর্পসের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইক এলভিস এক ভিডিও ব্রিফিংয়ে বলেছেন, “যে পরিস্থিতি আপনারা দেখতে যাচ্ছেন, তা ইচ্ছাকৃতভাবে ২০৩০ সালের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে, কারণ সেই সময়েই আমরা রাশিয়ার কাছ থেকে সবচেয়ে তীব্রতম হুমকি দেখতে পাচ্ছি।” সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ হলে, সামরিক শক্তি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত রাশিয়া আবারও ইউরোপে আক্রমণ করার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

এই মহড়ার আপাত লক্ষ্য হলো মস্কোকে দেখানো যে ডোনাল্ড ট্রাম্পের হুঙ্কার সত্ত্বেও, ন্যাটো তার বাল্টিক অঞ্চলের সবচেয়ে অরক্ষিত সদস্যদের প্রতিরক্ষা দিতে অন্তত অপারেশনালভাবে প্রস্তুত। তবে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ দর্শক হলো ওয়েস্টমিনস্টারে অবস্থিত প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, যারা গত কয়েক মাস ধরে ট্রেজারির সঙ্গে তহবিল নিয়ে টানাপোড়েনে রয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীকে নতুন করে সাজাতে ড্রোনসহ বিভিন্ন খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন পাউন্ড বিনিয়োগের প্রয়োজন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইউক্রেনে পরিচিতি পাওয়া সাধারণ ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোনের প্রয়োজনীয় ভলিউম তৈরি করতে প্রতি বছর ৫০ মিলিয়ন পাউন্ড এবং সশস্ত্র চালকবিহীন গাড়ির মতো অত্যাধুনিক মডেল তৈরি করতে প্রতি বছর ৫০০ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ হবে বলে অনুমান করা হয়েছে।

যদি আগামীকাল পূর্ব ইউরোপে পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর কাছে এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে ড্রোনের মজুদ ফুরিয়ে যাবে বলে ধারণা করা হয়, যেখানে দিনে মাত্র কয়েকশ ড্রোন নিক্ষেপ করা সম্ভব। এই ধারণার ভিত্তিতে, ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কাছে নজরদারি, বিমান প্রতিরক্ষা বা আক্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় ড্রোনের ৮০ থেকে ৯০ শতাংশের ঘাটতি রয়েছে।

‘আর্ক্যাড স্ট্রাইক’ নামের এই মহড়াটি ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি হতে পারে এমন ‘কৌশলগত রিজার্ভ কর্পস’ দেখানোর জন্য ডিজাইন করা হয়েছে বলে এলভিস জানিয়েছেন। বুধবার তিনজন জুনিয়র প্রতিরক্ষা মন্ত্রী এই গোপন বাঙ্কার পরিদর্শন করেন, যদিও প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি সরকারি কাজে ব্যস্ত থাকায় এস্তোনিয়া সফরে ছিলেন, যেখানে যুক্তরাজ্যের চতুর্থ ব্রিগেডের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট মহড়ার অংশ হিসেবে মোতায়েন আছে।

ভূগর্ভস্থ হলটি চেয়ার, কম্পিউটার এবং স্ক্রিনে ঠাসা, যা প্ল্যাটফর্ম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে; এটি ইউক্রেন যুদ্ধের পাশাপাশি সম্প্রতি ইরানের ওপর মার্কিন হামলার দ্বারা প্রভাবিত একটি অস্থায়ী ইউক্রেন-শৈলীর বাঙ্কার। তাত্ত্বিকভাবে এই কমান্ড সেন্টার ৫০০ জনকে জায়গা দিতে পারে এবং প্রতিদিন ১০ টেরাবাইট ডেটা প্রেরণ করতে সক্ষম, যা তিন মাসের নেটফ্লিক্স স্ট্রিমিংয়ের সমান।

মহড়ার পরবর্তী ধাপগুলি সতর্কভাবে সাজানো। মিশন ব্যাখ্যা করার জন্য, সাংবাদিকদের ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট পরতে বলা হয়, যা মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা অ্যান্ড্রিল সরবরাহ করেছে (মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে.ডি. ভ্যান্স এই কোম্পানির একজন বিনিয়োগকারী)। এই হেডসেটে যুদ্ধ পরিকল্পনার একটি থ্রিডি মডেল প্রদর্শিত হয়। যুদ্ধের এই চকচকে, কম্পিউটারাইজড চিত্রে, ড্রোনগুলির প্রথম তরঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও রাশিয়ান অবস্থানগুলি দ্রুত চিহ্নিত ও ধূলিসাৎ করা হয়।

অপারেশনটি সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে: ন্যাটো বাহিনী হাজার হাজার ড্রোন ব্যবহার করে রুশ বাহিনীর বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ চালাবে, শত্রুর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, অন্যান্য অবস্থান এবং সদর দফতর শনাক্ত করে ধ্বংস করবে, যার সঙ্গে থাকবে যুদ্ধবিমান ও আর্টিলারির সহযোগিতা – সীমান্ত থেকে সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত। এটি মোটেও সূক্ষ্ম কিছু নয়; এলভিস বলেছেন যে মহড়াগুলি পরিচালিত হচ্ছে “কারণ প্রতিপক্ষ দেখছে।”

এই মহড়ার একটি উদ্দেশ্য হলো ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ‘প্রজেক্ট অ্যাসগার্ড’-এর চিত্রায়ণ, এটি একটি ডিজিটাল যোগাযোগ ব্যবস্থা যা যুদ্ধক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (মার্কিন সংস্থা শিল্ড এআই-এর হাইভমাইন্ড রেফারেন্স করা হয়েছে) ব্যবহার করে, যে কোনো নজরদারি নোডকে যে কোনো অস্ত্রের সাথে সংযুক্ত করে। ইসরায়েলি এবং মার্কিন সামরিক বাহিনীর পথ অনুসরণ করে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মূল উদ্দেশ্য হলো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া, যার মধ্যে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণও অন্তর্ভুক্ত, ৭২ ঘণ্টা থেকে কমিয়ে ২ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা।

মহড়ায় একটি ভার্চুয়াল লক্ষ্যবস্তু চিহ্নিত করা হয়, যদিও তা কীভাবে করা হয় তা দেখানো হয়নি। এই অনুশীলনে একটি নতুন ‘ডিপ স্ট্রাইক’ ইউনিট অন্তর্ভুক্ত, যা এম২৭০ আর্টিলারি ব্যবহার করে ১৪৫ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম; এর অর্থ হলো, যদি রকেট লঞ্চার চ্যারিং ক্রসে থাকে তবে এটি লেস্টারে বোমা ফেলতে পারবে।

আক্রমণের জন্য অস্ত্রের প্রাপ্যতার উপর ভিত্তি করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে একটি ড্রপ-ডাউন মেনু থেকে তিনটি বোমা হামলার বিকল্প প্রস্তাব করা হয়। একটি আইকন নির্বাচন করার পর একটি নতুন স্ক্রিন লোড হয় এবং নিচের দিকে একটি লাল ঝলকানো ফায়ার বাটন প্রদর্শিত হয়।

ন্যাটোর সামরিক প্রধান, মার্কিন জেনারেল অ্যালেক্সাস গ্রিনকেউইচ একটি ভিডিও বার্তায় ব্রিটিশদের “এআই-ভিত্তিক কমান্ড পোস্টে রূপান্তরিত হওয়ার” প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছেন। আর্ক্যাড স্ট্রাইক মহড়ার সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো ভুল করেছে কিনা, তা কেউ অবগত বলে মনে হয় না, যদিও এটি ছিল কেবল একটি প্রদর্শনী।

এটি কেবল ২০৩০ সালের যুদ্ধ নয়, বরং ২০২২৬ সালেরও যুদ্ধ: ভূগর্ভের গভীরের তুলনামূলক নিরাপত্তা থেকে দূর থেকে দ্রুতগতিতে ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রাণঘাতী আঘাত হানার কৌশল। এদিকে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে আগামী মাসে প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধির জন্য আরও কয়েক বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ পাওয়ার প্রাথমিক ইঙ্গিত পাওয়া গেছে, যা ১৮ বিলিয়ন পাউন্ডের তহবিল ঘাটতি পূরণে এবং অদূর ভবিষ্যতের ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর জন্য অর্থায়নে সহায়ক হবে।

তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

0%
0%
0%
0%