সন্ত্রাস-ভুক্তভোগীদের সংহতি: যুক্তরাজ্যে ইহুদিদের সমর্থনে জোরালো আহ্বান

যুক্তরাজ্যে ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলার মুখে ঘৃণা ও সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছেন ডজনখানেক সন্ত্রাসী হামলার শিকার ও নিহতদের স্বজনেরা। ১৯টি পৃথক সন্ত্রাসী হামলার ভুক্তভোগী ও স্বজনেরা সম্প্রতি ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি সংহতি জানিয়ে একটি খোলা চিঠি লিখেছেন। চিঠিতে তাঁরা জোরালোভাবে উল্লেখ করেছেন, “ঘৃণার মুখে ঐক্যবদ্ধ থাকা শুধু সঠিক কাজ নয়, এটি সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।”
‘সারভাইভারস অ্যাগেইনস্ট টেরর’ (এসএটি) নামের একটি গোষ্ঠী এই চিঠি সমন্বয় করেছে। চলতি সপ্তাহের শুরুতে উত্তর লন্ডনে দুই ইহুদি পুরুষের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পর এই উদ্যোগ নেওয়া হয়। এটি যুক্তরাজ্যে ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর ধারাবাহিক হামলার সর্বশেষ ঘটনা।
জানা গেছে, গোল্ডার্স গ্রিনে শ্লোইম র্যান্ড (৩৪) এবং মোশে শাইন (৭৬)-কে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে ইসা সুলেইমান (৪৫) নামের এক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই দিনে সাউথওয়ার্কে ইসমাইল হুসেইন-কে হত্যাচেষ্টার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে। এই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্য সরকার চার বছরেরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো সন্ত্রাসী হুমকির মাত্রা “উল্লেখযোগ্য” থেকে বাড়িয়ে “মারাত্মক” করেছে। “ব্যাপক ইসলামপন্থী এবং চরম ডানপন্থী” হুমকির বৃদ্ধিই এর মূল কারণ বলে জানানো হয়েছে।
লিখিত চিঠিতে ভুক্তভোগীরা বলেছেন, “সন্ত্রাস হামলার শিকার ও ভুক্তভোগী হিসেবে আমরা ঘৃণা ও উগ্রবাদের ধ্বংসাত্মক মূল্য জানি। এসব ঘটনা আমাদের জীবন চিরতরে বদলে দিয়েছে এবং প্রিয়জনদের কেড়ে নিয়েছে।” চিঠিতে ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিদ্বেষ ও হামলার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং এর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আবেদন জানানো হয়েছে। ভুক্তভোগীরা ইহুদি সম্প্রদায়ের ভীতিকে গভীরভাবে উপলব্ধি করার কথা জানিয়েছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, “যারা ইসরায়েলের কার্যকলাপের ফলস্বরূপ এই ইহুদি-বিরোধী হামলাগুলোকে ন্যায্য প্রমাণ করতে চান, তারা শুধু ভুলই নন, তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করছেন যেখানে আরও হামলার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। অনুগ্রহ করে এটি বন্ধ করুন। একইভাবে, যারা সন্ত্রাসীর কার্যকলাপের জন্য সমস্ত মুসলিমকে দায়ী করেন, তারা এমন বিভাজন ও ঘৃণা তৈরি করেন যা সন্ত্রাসীরা কামনা করে।” এতে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদকে পরাজিত করার জন্য ঘৃণার মুখে ঐক্যবদ্ধ থাকার গুরুত্বের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, ইহুদি নাগরিকসহ দেশের সকল সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় নতুন করে অঙ্গীকার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
২০১৬ সালে ডানপন্থী উগ্রবাদীদের হাতে নিহত সংসদ সদস্য জো কক্স-এর স্বামী ব্রেন্ডন কক্স ‘সারভাইভারস অ্যাগেইনস্ট টেরর’ এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা। তিনি বলেন, “গত সপ্তাহের ইহুদি-বিরোধী হামলাগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হলে তা যথেষ্ট খারাপ হতো। কিন্তু তা ছিল না। এগুলো ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর একগুচ্ছ জঘন্য হামলার ধারাবাহিকতা, যা ভীতি ছড়ানোর উদ্দেশ্য নিয়ে করা হয়েছে।” ব্রেন্ডন কক্স আরও বলেন, “সন্ত্রাসবাদ কীভাবে জীবন ও সম্প্রদায়কে ধ্বংস করে, তা যারা জানেন, তাদের কাছ থেকে এটি আমাদের সবার প্রতি এক জরুরি আবেদন।”
চিঠিতে ৬২ জন স্বাক্ষর করেছেন, যাদের মধ্যে ২০১৫ সালে প্যারিসের বাতাক্লঁতে নিহত নিক আলেকজান্ডার-এর মা শিল্যাগ আলেকজান্ডার, ম্যানচেস্টার অ্যারেনা বোমা হামলায় নিহত মার্টিন হেট-এর মা ফিগেন মারে, এবং ২০১৭ সালের প্যালেস অফ ওয়েস্টমিনস্টার হামলার শিকার কেভিন টিপল রয়েছেন। এছাড়াও, ২০১৭ সালের লন্ডন ব্রিজ সন্ত্রাসী হামলায় বেঁচে ফেরা মারিন ভিনসেন্ট, ৭/৭ লন্ডন বোমা হামলার শিকার ক্রিশ্চিয়ান ফিশার এবং ৭/৭ হামলায় স্ত্রী বেহনাজ মোজাক্কাকে হারানো নাদের মোজাক্কাও এই চিঠির স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত।
লন্ডনের ফিশমঙ্গারস হল হামলার শিকার লিসা ঘিগিনি বলেন, “সন্ত্রাসী হামলার মধ্য দিয়ে যাওয়ার পর আমি সরাসরি দেখেছি ঘৃণা কী ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ রেখে যায়। কোনো সম্প্রদায়েরই এমন ভীতি বয়ে বেড়ানো উচিত নয়। সব ধরনের বিভাজনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থাকাটাই এটি ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করার একমাত্র উপায়।”
তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান