মালয়েশিয়ায় সহকর্মীর ধারালো অস্ত্রের আঘাতে নরসিংদীর দুই প্রবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু, দেড় মাস পর গ্রামে দাফন সম্পন্ন

নরসিংদীর শিবপুর উপজেলায় মালয়েশিয়ার তামান লিঙ্গি এলাকায় সহকর্মীর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়া দুই প্রবাসীর মরদেহ দেশে এনে দাফন সম্পন্ন হয়েছে। পরিবারের অসচ্ছলতা দূর করার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশ গিয়ে নির্মম এই পরিণতির শিকার হওয়া নিহতদের স্বজন ও এলাকাবাসী এখন অভিযুক্তের উপযুক্ত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একইসঙ্গে পরিবারের চরম দুর্বিপাকে সরকারি সহায়তার আকুল আবেদন জানিয়েছেন তাঁরা।

নিহতদের স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে ১৮ বছর আগে মালয়েশিয়ায় পাড়ি জমান নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার নৌকাঘাটা এলাকার মোহাম্মদ আলীর ছেলে কিরন মিয়া। অন্যদিকে, পরিবারের হাল ধরতে চার বছর আগে একই উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন প্রতিবেশী ধনাইয়া গ্রামের মাতৃহীন সাইজুল ইসলামের ছেলে মোহশিন মিয়া। তারা দুজনসহ অপর দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও অভিযুক্ত ইদ্রিছ আলী মালয়েশিয়ার পোর্ট ডিকসনের তামান লিঙ্গি এলাকার একটি বাড়িতে যৌথভাবে বসবাস করতেন এবং একই মালিকের বাগানে একসঙ্গে কাজ করতেন।

চলতি বছরের ৩ আগস্ট বিকেলে নিজেদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা ও কথাকাটাকাটির জেরে নৃশংস হয়ে ওঠেন ইদ্রিছ আলী। তিনি ধারালো অস্ত্র দিয়ে সহকর্মী কিরন মিয়া, মোহশিন মিয়া ও নজরুল ইসলামকে নির্মমভাবে হত্যা করেন। খবর পেয়ে মালয়েশিয়ার লিঙ্গি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে অভিযান চালিয়ে মূল অভিযুক্ত মো. ইদ্রিস আলীকে আটক করে। এই ঘটনায় মো. কাজল মণ্ডল নামের আরেকজন বাংলাদেশি গুরুতর আহত হয়ে রেমবাউ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ দেড় মাস পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো দেশে ফিরিয়ে আনা হয়। নিহত মোহশিনের মরদেহ গত ১২ সেপ্টেম্বর নিজ গ্রামে পৌঁছানোর পর সামাজিক জানাজা শেষে স্থানীয় কবরস্থানে দাফন করা হয়। ছোট বোনকে হারানোর অল্প কিছুদিনের মাথায় একমাত্র উপার্জনক্ষম ভাইকে হারিয়ে নিহতের মা শাহানা বেগম ও ছোট ভাই রুবেল শোকে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

এর একদিন পর ১৩ সেপ্টেম্বর কিরন মিয়ার মরদেহ শিবপুরের বাড়িতে এনে দাফন করা হয়। নয় ভাইবোনের মধ্যে চতুর্থ কিরন পরিবারে স্ত্রী, তিন ছেলে ও এক মেয়ে রেখে গেছেন। সংসারের একমাত্র অভিভাবককে হারিয়ে পরিবারটি এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। নিহত কিরন মিয়ার ভাই হারুন অর রশিদ জানান, তাঁর ভাই সারা জীবন পরিবার ও সন্তানদের ভরণপোষণ জুগিয়েছেন, কিন্তু নিজের জন্য কোনো সঞ্চয় করতে পারেননি। এখন সরকারি সাহায্য ছাড়া এই অবুঝ সন্তানদের নিয়ে বেঁচে থাকা তাঁদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়েছে। নিহত মোহশিনের ছোট ভাই রুবেল জানান, বাবা আগেই মারা গেছেন এবং কিছুদিন আগে বোনটিও মারা গেছে। একমাত্র ভাইকে হারিয়ে তাঁদের মা প্রায় পাগল প্রায়।

মালয়েশিয়া পুলিশ ঘটনার প্রাথমিক তদন্তে জানতে পেরেছে, নিহত, আহত এবং অভিযুক্ত সকলেই একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার পাশাপাশি এক ছাদের নিচে বসবাস করতেন এবং তুচ্ছ বাকবিতণ্ডাই এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডের কারণ। অভিযুক্ত ইদ্রিস আলীর বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় হত্যা মামলা রুজু করা হয়েছে এবং জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চেয়ে তাঁকে পোর্ট ডিকসন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। অভিযুক্তের বিরুদ্ধে তিনজনকে হত্যার পাশাপাশি অপর একজনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগও যুক্ত করা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে দেশটির আইন অনুযায়ী অভিযুক্তের মৃত্যুদণ্ড অথবা দীর্ঘ মেয়াদী সশ্রম কারাদণ্ড এবং বেত্রাঘাত হতে পারে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও উপযুক্ত বিচার দাবি করেছেন স্থানীয়রা।

০%
০%
০%
০%