AdvertisementAdvertisement

মানবাধিকার কর্মী জসবন্ত সিং খালরা হত্যাকাণ্ডের তিন দশক পর স্মৃতি ও সংগ্রামের কথা বললেন কন্যা নাভকিরণ

ভারতের পাঞ্জাবে আশির দশকে শিখ বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে হাজারো মানুষের নিখোঁজ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের তথ্য ফাঁস করেছিলেন মানবাধিকারকর্মী যশবন্ত সিং খালরা। এই সাহসী কার্যক্রমের জন্য ১৯৯৫ সালে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করে পাঞ্জাব পুলিশ। ঘটনার তিন দশক পেরিয়ে গেলেও সেই শোক ও লড়াইয়ের স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছেন তার কন্যা নাভকিরান কৌর খালরা। সম্প্রতি তার বাবার জীবন ও সংগ্রামের ওপর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘সাতলুজ’ ভারত সরকার কর্তৃক ওটিটি প্ল্যাটফর্ম থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আল-জাজিরার সাথে এক বিশেষ আলাপচারিতায় নাভকিরান তুলে এনেছেন সেই বিভীষিকাময় সময়ের স্মৃতি ও ন্যায়বিচারের দীর্ঘ লড়াইয়ের কথা।

১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকালে পাঞ্জাবের তারন তারন এলাকা থেকে পুলিশ যশবন্ত সিং খালরাকে তুলে নিয়ে যায়। ঘটনার দিন সকালে বাড়িতে পুলিশের উপস্থিতি দেখেও নাভকিরানরা আঁচ করতে পারেননি কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে তাদের জন্য। নাভকিরান জানান, নিখোঁজের পর পুলিশ স্থানীয় থানায় অভিযোগ গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। উল্টো তৎকালীন পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তাদের মামলা তুলে নেওয়ার বিনিময়ে খালরাকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন। দীর্ঘ তিন বছর পরিবারটি বিশ্বাস করত যে যশবন্ত সিং খালরা হয়তো বেঁচে আছেন, কিন্তু ১৯৯৮ সালে এক প্রাক্তন পুলিশ কর্মকর্তার জবানবন্দিতে তার ওপর চালানো অবর্ণনীয় নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের তথ্য বেরিয়ে এলে সব আশা চূর্ণ হয়ে যায়।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

যশবন্ত সিং খালরা পেশায় একজন ব্যাংক ব্যবস্থাপক ছিলেন। তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে, পাঞ্জাবের নিরাপত্তা বাহিনী ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা করে তাদের মরদেহ ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে পুড়িয়ে ফেলেছে। এই তথ্য প্রকাশের পর থেকেই তার ওপর প্রাণনাশের হুমকি বাড়তে থাকে। এমনকি সরকারি দলের অনেক নেতা তাকে এই পথ থেকে সরে আসতে সতর্ক করেছিলেন। তবে ভয় পাননি যশবন্ত। তিনি বলতেন, যে পুলিশের বিরুদ্ধে নিখোঁজের অভিযোগ, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে চলা সম্ভব নয়। ৩১ আগস্ট ১৯৯৫ সালে পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী বিয়ন্ত সিং নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সেই সময় বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা আত্মগোপনে যেতে অনুরোধ করলেও, পরিবারের সুরক্ষার কথা ভেবে যশবন্ত বাড়ি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানান।

দীর্ঘ ১৬ বছরের আইনি লড়াই শেষে যশবন্ত সিং খালরার হত্যাকারীদের কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান। তবে নাভকিরানের মতে, এই রায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারেনি। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, শিখ সম্প্রদায়ের প্রতি রাষ্ট্রের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ধীরগতি তাদের পরিবারকে বারবার হতাশ করেছে। কেবল একজন মানুষকে হারানো নয়, বরং হাজারো পরিবারের প্রিয়জনদের মৃত্যুসনদ না পাওয়ার মতো বিষয়গুলো আজও এক গভীর সংকটের জন্ম দিচ্ছে। রাষ্ট্র ও সমাজের অসহযোগিতায় পরিবারগুলো বছরের পর বছর অনিশ্চয়তায় দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি যশবন্ত সিং খালরার জীবনের ছায়া অবলম্বনে নির্মিত ‘সাতলুজ’ চলচ্চিত্রটি ভারত সরকারের সেন্সর বোর্ড তিন বছর আটকে রাখার পর ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তির ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই নিষিদ্ধ করে। নাভকিরান জানান, ছবিটি নিষিদ্ধ হওয়ায় তারা অবাক হননি, বরং জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদে তারা আশান্বিত। পাঞ্জাবের গ্রাম থেকে শুরু করে নানা জনপদে মানুষ প্রজেক্টরের মাধ্যমে ছবিটি প্রদর্শন করেছে, যা প্রমাণ করে যে তিন দশক পরেও যশবন্ত সিং খালরার অনুসন্ধিৎসু সত্তা ও তার সংগ্রামের গল্প আজও মানুষের মনে জীবন্ত। রাষ্ট্র যশবন্তের আওয়াজ স্তব্ধ করতে চাইলেও, সত্য যে চাপা থাকেনি, এই চলচ্চিত্রটির প্রতি মানুষের সমর্থনই তার জ্বলন্ত প্রমাণ।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%