হরমুজ প্রণালী দিয়ে নতুন নৌপথ নির্ধারণে ওমানের সঙ্গে ইরানের সমঝোতা চূড়ান্ত পর্যায়ে

হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি নতুন নৌপথ নির্ধারণের লক্ষ্যে ওমানের সঙ্গে চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছেছে ইরান। বুধবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তবে এই উদ্যোগ সত্ত্বেও হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি নিরাপদ হওয়ার নিশ্চয়তা দেয়নি তেহরান। ইরানের অভিযোগ, দেশটির বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নৌ অবরোধ বহাল থাকায় সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনও অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ, যার ওপর দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। যুদ্ধের সূচনালগ্ন থেকেই এই জলপথে জাহাজ চলাচল চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি বিশ্ব অর্থনীতিতে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি করেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত চুক্তিতে পারস্য উপসাগরে প্রবেশকারী জাহাজগুলো ইরান-নিয়ন্ত্রিত রুট এবং বেরিয়ে যাওয়ার সময় ওমান-নিয়ন্ত্রিত রুট ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। এছাড়া সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ রক্ষার অজুহাতে নির্দিষ্ট হারে পরিষেবা ফি আদায়ের পরিকল্পনাও রয়েছে তেহরানের।
এদিকে, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্যমতে, এই খসড়া চুক্তিটি এখন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনেইয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এটি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়, বরং একটি অস্থায়ী ব্যবস্থা মাত্র। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনার পথ প্রশস্ত হতে পারে। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আগে থেকেই এমন যেকোনো চুক্তির তীব্র বিরোধিতা করে আসছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ বা আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের প্রচলিত নিয়ম পরিবর্তন হতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আলোচনার অগ্রগতি নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিলেও, ইরান বারবার দাবি করে আসছে যে, মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়। ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি স্পষ্ট করেছেন যে, প্রস্তাবিত এই নতুন নৌপথটি স্থায়ী নয় এবং এটি সর্বোচ্চ দুই থেকে চার মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকতে পারে। এই অনিশ্চয়তার প্রতিফলন দেখা গেছে আন্তর্জাতিক বাজারেও; বৃহস্পতিবার এশীয় বাজারে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ০.৩ শতাংশ হ্রাস পেয়ে প্রতি ব্যারেল ৭৯.২৪ ডলারে নেমে আসে।
সামগ্রিক ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। একদিকে হরমুজ প্রণালী নিয়ে আলোচনার গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, অন্যদিকে লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতা এবং লেবানন সীমান্তে ইজরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ড মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে যখন ইরান ও ওমান চুক্তি চূড়ান্ত করার পথে এগোচ্ছে, তখন ইয়েমেন উপকূলের কাছে এডেন উপসাগরে বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ও সৌদি আরবের বন্দরে হুথি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি পরিস্থিতিকে নতুন করে উত্তপ্ত করে তুলেছে। সব মিলিয়ে, হরমুজ প্রণালীর নৌপথ নিয়ে সামান্য আশার আলো দেখা দিলেও, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নিরসনে এখনো দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়া বাকি।
তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস
