বিশ্ব রাজনীতির গতিপ্রকৃতিতে এক বড়সড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে মার্কিন গবেষণা সংস্থা পিউ রিসার্চ সেন্টারের সাম্প্রতিক সমীক্ষায়। গত প্রায় দুই দশক ধরে বৈশ্বিক জনমতে আমেরিকার যে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল, তা এখন প্রশ্নের মুখে। সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩৬টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে ২৫টিতেই মানুষ এখন আমেরিকার তুলনায় চীনকে অধিকতর ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের বিতর্কিত আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত, মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং পশ্চিম এশিয়ার অস্থিরতা বিশ্ববাসীর এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত এই ব্যাপকভিত্তিক সমীক্ষাটি পরিচালিত হয়। এই সময়ে ইরানকে কেন্দ্র করে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়। সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, বিশ্বের বহু দেশের নাগরিকরা মনে করেন বিশ্বশান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে আমেরিকা তার আগের সেই ইতিবাচক ও নির্ভরযোগ্য ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের সহযোগী গবেষণা পরিচালক লরা সিলভারের মতে, গত প্রায় ২০ বছরে এই প্রথমবার চীন বৈশ্বিক জনমতে আমেরিকার চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, করোনা মহামারির প্রভাব কাটিয়ে ওঠার পর আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর আস্থা কমেছে। এর বিপরীতে চীনকে এখন অনেকেই তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল এবং অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছেন।
জনপ্রিয়তার লড়াইয়ে শুধু দেশ নয়, ব্যক্তিগত পর্যায়েও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পিছিয়ে পড়েছেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের চেয়ে। ৩৬টি অঞ্চলের মধ্যে ২২টিতেই মানুষ শি জিনপিংয়ের ওপর বেশি আস্থা রাখেন। কানাডা, মেক্সিকো, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ব্রিটেনের মতো গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশগুলোতেও ট্রাম্পের চেয়ে শি জিনপিংয়ের গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। যদিও গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন যে, অনেক দেশেই এই দুই নেতার প্রতিই মানুষের আস্থার সংকট রয়েছে।
কানাডার জনমতের পরিবর্তন বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। ২০২৩ সালে যেখানে ৫৭ শতাংশ কানাডিয়ান আমেরিকাকে ইতিবাচকভাবে দেখতেন, সেখানে বর্তমানে সেই হার নাটকীয়ভাবে কমে ৩৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উল্টো দিকে, একই সময়ে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ১৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৪ শতাংশে পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের অভিমত, ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর শুল্কনীতি এবং কানাডাকে নিয়ে করা অবমাননাকর মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্কের গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে।
ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলোতেও আমেরিকার জনপ্রিয়তা নিম্নমুখী। ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, সুইডেন এবং ব্রিটেন—এই সবকটি দেশেই আমেরিকার গ্রহণযোগ্যতা কমেছে। বিশেষ করে ব্রিটেনে গত বছর ৬০ শতাংশ মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও এখন আমেরিকা ও চীনের গ্রহণযোগ্যতার ব্যবধান প্রায় সমান পর্যায়ে নেমে এসেছে।
তবে কিছু দেশে এখনও আমেরিকার অবস্থান শক্তিশালী। ইজরায়েলে প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ আমেরিকার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন, যেখানে চীনের পক্ষে এই হার মাত্র ১৯ শতাংশ। এ ছাড়াও জাপান, ভারত, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপিন্স এবং পোল্যান্ডের মতো দেশগুলোতে আমেরিকার ভাবমূর্তি চীনের চেয়ে ভালো রয়েছে। যদিও এই দেশগুলোতেও সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকার প্রতি জনসমর্থন আগের চেয়ে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
মানবাধিকার ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষার প্রশ্নে আমেরিকা এখনও চীন থেকে এগিয়ে থাকলেও, সেই ব্যবধান ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে। ২০২১ সালের তুলনায় বর্তমানে অনেক কম মানুষ মনে করেন যে মার্কিন সরকার নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে যথাযথ মর্যাদা দেয়। ৩৫টি দেশ এবং পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমসহ মোট ৩৬টি অঞ্চলে ৪২ হাজারের বেশি মানুষের ওপর চালানো এই সমীক্ষাটি বিশ্ব রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য যে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছে, তারই এক স্পষ্ট বার্তাবাহক।