লংমার্চ কর্মসূচি পরিহার করে সংবিধান সংস্কারসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে বসার জন্য বিরোধী দলগুলোর প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। শনিবার (৩১ অক্টোবর) ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর মনসুন থিয়েটারে আয়োজিত ‘গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা’ শীর্ষক এক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই আহ্বান জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলেন, কেবল লংমার্চের মতো কর্মসূচি দিয়ে কোনো জটিল জাতীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। বরং দেশের বর্তমান সংকট উত্তরণে এবং সংবিধানে প্রয়োজনীয় ও কাঙ্ক্ষিত সংস্কার আনতে সব রাজনৈতিক দলের মধ্যে ন্যূনতম ঐকমত্য ও সমঝোতা অত্যন্ত জরুরি। ভবিষ্যতে দেশে আর কখনো যেন কোনো স্বৈরশাসন বা ফ্যাসিবাদের উত্থান না ঘটে এবং নতুন করে কোনো ‘জুলাই জাদুঘর’ তৈরির প্রয়োজন যেন না পড়ে, সে জন্য বিরোধী দলগুলোর আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি মজবুত করতে প্রাতিষ্ঠানিক ‘চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স’ বা নিয়ন্ত্রণ ও ভারসাম্য নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ জোর দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার স্থায়ী আইনি কাঠামো এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে গণতন্ত্র রক্ষায় কার্যকর ওয়াচডগ বা অতন্দ্র প্রহরী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। এ সময় দেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছিল, যা পরবর্তীতে সাংবিধানিক সংকট ও স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল। একই সঙ্গে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করাকে দেশের গণতন্ত্র ধ্বংস এবং ফ্যাসিবাদী শক্তির উত্থানের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে চিহ্নিত করেন তিনি।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর মহাপরিচালক এহসান মাহমুদ। এতে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের সাবেক সদস্য ফিরোজ আহমেদ এবং সুপ্রিম কোর্টের বিশিষ্ট আইনজীবী হাবিবুর রহমান। বক্তারা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও সাংবিধানিক সংস্কারের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন।
ভবিষ্যতের রাষ্ট্রকাঠামো কেমন হওয়া উচিত সে বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পাশাপাশি বিচারকদের জবাবদিহিও কঠোর আইনের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গই অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে উঠতে না পারে। এ ছাড়া সংসদীয় ব্যবস্থায় উচ্চকক্ষ প্রবর্তন, নির্বাচনী পদ্ধতিতে পিআর (প্রোপোশনাল রিপ্রেজেন্টেশন) পদ্ধতি এবং গণভোটসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে খোলামেলা আলোচনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা বিভাজনের রাজনীতি সরকার চায় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা এবং তরুণ প্রজন্মের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে জাতীয় ঐক্যই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।