বিশ্বের শীর্ষ ব্যাঙ্কিং তালিকার শীর্ষে চীনের আধিপত্য ও ভারতের কৌশলগত চ্যালেঞ্জের বিশ্লেষণ

সম্পদের আকারের নিরিখে বিশ্বের বৃহত্তম চারটি ব্যাঙ্কের মালিক এখন চীন। দ্য ব্যাংকার সাময়িকীর সাম্প্রতিক র‍্যাঙ্কিং অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ দশটি ব্যাঙ্কের মধ্যে সাতটিই চীনের এবং এর সবগুলোই বেইজিং সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের তথ্যমতে, বৈশ্বিক আর্থিক শক্তি হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরও সুসংহত করতে চীন এই সাফল্য অর্জন করেছে।

তালিকা অনুযায়ী, বিশ্বের শীর্ষ চারটি ব্যাঙ্ক হলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড কমার্শিয়াল ব্যাঙ্ক অব চায়না, চায়না কনস্ট্রাকশন ব্যাঙ্ক, এগ্রিকালচারাল ব্যাঙ্ক অব চায়না এবং ব্যাঙ্ক অব চায়না। টিয়ার-ওয়ান মূলধনের ভিত্তিতে তৈরি এই তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের জেপিমরগ্যান চেজ। প্রথমবারের মতো পোস্টাল সেভিংস ব্যাঙ্ক অব চায়না শীর্ষ দশের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাঙ্ক অব আমেরিকা ও সিটিগ্রুপ যথাক্রমে ষষ্ঠ ও অষ্টম স্থানে অবস্থান করছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত চীনা ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ৫৪.৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত সম্পদ ২৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তবে লাভের হিসেবে মার্কিন ব্যাঙ্কগুলো এখনও এগিয়ে রয়েছে। শীর্ষ এক হাজার ব্যাঙ্কের তালিকায় চীনা ব্যাঙ্কগুলোর সম্মিলিত কর-পূর্ব মুনাফা ৩৯২ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে মার্কিন ব্যাঙ্কগুলোর মুনাফা ৩২৮ বিলিয়ন ডলার। বিশেষজ্ঞদের মতে, মুনাফার গুণগত মান ও দক্ষতার দিক থেকে মার্কিন আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে।

বিশ্ব ব্যাঙ্কিংয়ের এই প্রতিযোগিতায় ভারতের অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৮৭৭ বিলিয়ন ডলারের সম্পদ নিয়ে ভারতের বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া তালিকার ৪৫তম স্থানে রয়েছে এবং বেসরকারি খাতের এইচডিএফসি ব্যাঙ্ক রয়েছে ৭৬তম অবস্থানে। ১৯৯১ সালে নরসিমহম কমিটির রিপোর্টে আন্তর্জাতিক মানের ৩ থেকে ৪টি বৃহৎ ভারতীয় ব্যাঙ্ক গড়ে তোলার সুপারিশ করা হয়েছিল। ৩৫ বছর পার হয়ে গেলেও এবং দফায় দফায় ব্যাঙ্কের সংযুক্তিকরণ সম্পন্ন করার পরেও ভারত সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি।

ভারত সরকার ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এখন বড় প্রশ্ন হলো, স্রেফ তালিকার শীর্ষে ওঠার জন্য ব্যাঙ্কের আকার বাড়ানো কতটা যুক্তিযুক্ত। ১৯৯০ সালে বিশ্বের শীর্ষ স্থানে থাকা জাপানি ব্যাঙ্ক সুমিতোমো পরবর্তী এক দশকে দেউলিয়া হওয়ার পথে চলে গিয়েছিল, যা অন্ধ দৌড়ের ঝুঁকিকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই টিয়ার-ওয়ান মূলধন কৃত্রিমভাবে বৃদ্ধি করার চেয়ে সেই পুঁজির কার্যকর ব্যবহার ভারতের জন্য অধিক গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় পরিকাঠামো উন্নয়ন ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ঋণদাতা হিসেবে প্রভাব বিস্তারের জন্য শক্তিশালী ব্যাঙ্কিং কাঠামোর কোনো বিকল্প নেই।

ভারতের নিজস্ব পেমেন্ট নেটওয়ার্ক বা রূপিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রসারের প্রচেষ্টা দেশটির অর্থনৈতিক পাইপলাইন বা 'প্লাম্বিং' ব্যবস্থাকে মজবুত করার এক ইতিবাচক পদক্ষেপ মাত্র। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অর্থনৈতিক মডেলের চেয়েও জরুরি হলো নিজস্ব নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা, যা ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। ভারতের আজ কেবল শীর্ষ দশের তালিকায় নাম তোলা প্রয়োজন নয়, বরং প্রয়োজন এমন গভীর পুঁজি সম্পন্ন ব্যাঙ্কিং কাঠামো যা দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের জোগান দেওয়ার পাশাপাশি বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপ থেকে অর্থনীতিকে মুক্ত রাখবে।

তথ্যসূত্র: হিন্দুস্থান টাইমস

০%
০%
০%
০%