যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের ১৪ দফা সমঝোতা চুক্তি ঘিরে অস্পষ্টতা ও শঙ্কা

যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক নিয়ে বিশ্বজুড়ে কৌতূহল ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। বুধবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির বিষয়বস্তু নিয়ে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক বর্ণনা দেওয়া হলেও, চূড়ান্ত চুক্তির কোনো অনুলিপি এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। ফলে ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগটি এখনো অসংখ্য অস্পষ্টতায় ঘেরা।

চুক্তির প্রথম ধারায় সব পক্ষ লেবাননসহ সকল রণক্ষেত্রে সামরিক অভিযান অবিলম্বে এবং স্থায়ীভাবে বন্ধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া লেবাননের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তবে বিস্ময়কর বিষয় হলো, চুক্তিতে ইসরায়েলের কোনো উল্লেখ নেই। অথচ ইসরায়েল বর্তমানে লেবাননের এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে এবং মার্চের শুরু থেকে সেখানে নিয়মিত বিমান হামলা চালিয়ে আসছে, যার ফলে অন্তত ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন ও ১০ লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে লেবানন, সিরিয়া এবং গাজায় ইসরায়েলি বাহিনী অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের অবস্থানে থাকবে। ইরান বারবার বলে এসেছে যে, লেবাননে ইসরায়েলি আগ্রাসন বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত কোনো শান্তি চুক্তি সম্ভব নয়। এমতাবস্থায়, ইরান ও হিজবুল্লাহর সঙ্গে চুক্তিতে ইসরায়েল স্বাক্ষরকারী না হওয়ায় এই যুদ্ধবিরতি কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।

দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে উভয় দেশ একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার অঙ্গীকার করেছে। এটিকে ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান সরকার পরিবর্তনের উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও গত ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন হামলার সময় ট্রাম্প তেহরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের ডাক দিয়েছিলেন, তবে সম্প্রতি তিনি দাবি করেছেন যে, তিনি কখনো 'রেজিম চেঞ্জ' বা শাসন পরিবর্তনের বিষয়টি নিয়ে ভাবেননি।

চুক্তির চতুর্থ ও পঞ্চম অনুচ্ছেদে ইরানি বন্দরগুলোতে আরোপিত মার্কিন নৌ-অবরোধ ৩০ দিনের মধ্যে প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের পথ সুগম করার বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ এবং ট্রানজিট ফি নিয়ে ইরান এখনো অনড়। তেহরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থায় তারা ফিরে যাবে না এবং সামুদ্রিক সেবার বিনিময়ে তারা ফি আদায় অব্যাহত রাখবে, যা আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উচ্চাকাঙ্ক্ষা থেকে সরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ইরান চুক্তিতে জানিয়েছে, তারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না। তবে সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ইরান তা বিদেশে পাঠানোর পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার (আইএইএ) তদারকিতে দেশে রেখেই 'ডাউন-ব্লেন্ডিং' বা মান কমিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের উপযোগী করার প্রক্রিয়ায় সম্মতি দিয়েছে।

চুক্তির ষষ্ঠ অনুচ্ছেদে ইরানের পুনর্গঠনের জন্য আঞ্চলিক অংশীদারদের মাধ্যমে অন্তত ৩০ হাজার কোটি ডলারের অর্থনৈতিক সহায়তার রূপরেখা দেওয়া হয়েছে। তবে এই বিশাল অর্থের যোগানদাতা কারা হবে এবং তার ওপর কী ধরনের শর্ত থাকবে, তা নিয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই। এছাড়া সপ্তম অনুচ্ছেদে ইরানের ওপর আরোপিত সকল নিষেধাজ্ঞা ধাপে ধাপে তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, তা কেবল মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নাকি জাতিসংঘের আওতাভুক্ত নিষেধাজ্ঞাও—সে বিষয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

০%
০%
০%
০%