সুদানে বিদ্যুৎ সংকট চরমে: জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় বিপর্যস্ত জনজীবন

ক্রমবর্ধমান জ্বালানির দাম এবং চলমান অর্থনৈতিক অস্থিরতা আফ্রিকার দেশ সুদানের বিদ্যুৎ সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। দেশটির বিভিন্ন শহর ও অঞ্চলে টানা বিদ্যুৎ বিভ্রাটে দৈনন্দিন জীবন কার্যত অচল হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা হুসনা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, “আমার প্রতিটি দিন এখন ছোট ছোট সমস্যার সঙ্গে লড়াই করে কাটাতে হয়, যা ধীরে ধীরে এক বিশাল বোঝায় পরিণত হয়েছে। আগে বিদ্যুৎ স্বাভাবিক থাকলে দৈনন্দিন গৃহস্থালির কাজ অনেক সহজ ছিল।”
বিশ্লেষকদের মতে, সুদানের বিদ্যুৎ অবকাঠামো বহু আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল। তার ওপর সুদানের সশস্ত্র বাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সের মধ্যে চলমান সংঘাত—যা এখন চতুর্থ বছরে—পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও সংকটকে বাড়িয়ে তুলেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরান সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল সুদান উপসাগরীয় সরবরাহ শৃঙ্খল ও শিপিং রুটে বিঘ্নের কারণে আরও চাপে পড়েছে।
ফলস্বরূপ, গত দুই সপ্তাহে দেশটির বহু শহর বড় ধরনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে। যদিও বিদ্যুৎ বিভ্রাট নতুন নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতি নজিরবিহীন—যা জনজীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করছে।
অর্থনৈতিক অবস্থাও দ্রুত অবনতির দিকে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সুদানিজ পাউন্ড প্রায় ২০ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে। কালোবাজারে প্রতি মার্কিন ডলার ৩৯০ পাউন্ডের বেশি দামে লেনদেন হচ্ছে। একই সঙ্গে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবহন, খাদ্য ও নিত্যপণ্যের দামও ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
সরকার চলতি বছরের জানুয়ারিতে রাজধানী খার্তুমে ফিরে এসে বিদ্যুৎসহ মৌলিক সেবাগুলো পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ছে সাধারণ মানুষের জীবনে। বিদ্যুৎ না থাকায় খাদ্য সংরক্ষণ অসম্ভব হয়ে পড়েছে। হুসনা জানান, এখন তাকে প্রতিদিন রান্না করে একই দিনেই খাবার খেতে হচ্ছে। সন্ধ্যায় পরিবারকে অন্ধকার ও গরমের মধ্যে থাকতে হয়।
তার ১৬ বছর বয়সী মেয়ে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় পড়াশোনায় বড় বাধা তৈরি হয়েছে। “সে মোমবাতির আলোতে পড়তে বাধ্য হচ্ছে, যা মনোযোগ ধরে রাখার জন্য উপযুক্ত নয়,” বলেন হুসনা।
অন্যদিকে, হুসনার স্বামী আহমেদ আলী একজন গাড়ি মেকানিক। তার কর্মশালার অনেক কাজ বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ চলে গেলে কাজ ধীর হয়ে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। আগে জেনারেটর ব্যবহার করে কাজ চালানো গেলেও জ্বালানির অতিরিক্ত দামের কারণে সেটিও এখন সম্ভব নয়।
তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষে পেট্রোলের দাম প্রতি লিটার ৪,৮৬০ সুদানিজ পাউন্ড থেকে বেড়ে ৬,৮৭০ পাউন্ডে পৌঁছেছে—যা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ৪০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
এই পরিস্থিতিতে পরিবহন খাতও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খার্তুমের বাসচালক ইয়াসির আল-বালহাভি বলেন, “এখন আমার দিন শুরু হয় না কত ট্রিপ দেব তা দিয়ে, বরং কতক্ষণ গ্যাস স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে তা দিয়ে। প্রতিদিন পরিস্থিতি আরও কঠিন হচ্ছে।”
বাজারেও এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে। দক্ষিণ খার্তুমের এক ব্যবসায়ী জানান, ক্রেতা কমে গেছে এবং পণ্যের সরবরাহ ব্যয় বেড়েছে। তাপমাত্রা বেশি হওয়ায় এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকায় অনেকেই বাজারে আসতে চান না। সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে খাদ্যপণ্যের দামও দ্রুত বাড়ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে ১০ কেজি চিনির দাম ২৮,০০০ থেকে ৩৫,০০০ পাউন্ডে, ৫০ কেজি আটার দাম ৪৭,০০০ থেকে ৫৫,০০০ পাউন্ডে এবং রান্নার তেলের দাম ৩০,০০০ থেকে ৩৭,০০০ পাউন্ডে পৌঁছেছে।
অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আল-তায়েব বলেন, “সুদানের অর্থনীতি এমনভাবে গড়ে উঠেছে, যা জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দ্রুত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকে প্রভাবিত করে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট একে অপরকে আরও তীব্র করে তোলে।”
তিনি আরও বলেন, “এটি শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, এটি একটি অবকাঠামোগত সংকটও। বিদ্যমান ব্যবস্থা দেশের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়।”
স্থানীয় পর্যায়ে কিছু বিকল্প উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সীমিত। অনেক এলাকায় জেনারেটরের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার শুরু হয়েছে, তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট সুদানের মানুষের জন্য নতুন কিছু নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতি তাদের সহনশীলতার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে।
হুসনার ভাষায়, “বিদ্যুৎ না থাকা এখন আর সাময়িক সমস্যা নয়। এটি আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে—যা ক্রমেই অসহনীয় হয়ে উঠছে।”
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা