Advertisement

লেবাননের ধ্বংসস্তূপের মাঝে আশার প্রদীপ হয়ে টিকে আছেন সিভিল ডিফেন্স প্রধান আলী সাফিউদ্দিন

লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর টায়ারের সিভিল ডিফেন্স প্রধান আলি সাফিউদ্দিনের জীবন এখন শোক আর সাহসের এক অনন্য আখ্যান। আল জাজিরার নতুন প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ওয়ানস উই কুড নট সেভ’-এ উঠে এসেছে যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে প্রাণ বাঁচানোর এক অকুতোভয় সেনানির গল্প। ইসরায়েলি বাহিনীর আকাশ হামলার পর ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া সাধারণ মানুষকে উদ্ধার করাই যার জীবনের ব্রত।

চলতি জুনের শেষভাগে এক সাক্ষাৎকারে সাফিউদ্দিন জানান, ‘ইয়েলো লাইন’ বা ইসরায়েলি বাহিনীর ঘোষিত নিরাপত্তা বলয়ের কাছাকাছি অঞ্চলগুলোতে এখনও নিয়মিত গোলাবর্ষণ ও বোমা হামলার ঘটনা ঘটছে। যদিও টায়ারের মতো বড় শহরগুলো বর্তমানে কিছুটা শান্ত, তবুও লেবানন সীমান্তের ১০ কিলোমিটার ভেতরে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতা এবং অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সাফিউদ্দিনের ব্যক্তিগত জীবনে যুদ্ধের দগদগে ক্ষত আজও অমলিন। ২০০৬ সালের যুদ্ধের সময় তিনি তার স্ত্রী ও এক বছর বয়সী কন্যা লিনকে সিভিল ডিফেন্স সেন্টারের নিচের নিরাপদ আশ্রয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ইসরায়েলি হামলায় ভবনটি ধ্বংস হয়ে গেলে লিন নিহত হয়। সেই শোক তাকে প্রতিনিয়ত তাড়া করলেও, অন্যের জীবন বাঁচানোর তাগিদই তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, তার উদ্ধার অভিযান যেন তার মৃত কন্যার আত্মারই প্রতিফলন। ২০২০ সালে বৈরুতের ভয়াবহ বিস্ফোরণের পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে টানা ১৮ ঘণ্টার পরিশ্রমে এক কিশোরীকে উদ্ধার করেছিলেন তিনি। সাফিউদ্দিনের ভাষ্যমতে, সেই মেয়েটি বেঁচে ফেরায় তিনি তার নিজের কন্যার অস্তিত্বই যেন নতুন করে খুঁজে পেয়েছিলেন।

বিজ্ঞাপন

তবে এই ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় সহকর্মীদের হারানো সাফিউদ্দিনের জন্য সবচেয়ে কষ্টের। গত ২৮ এপ্রিল মাজদাল জৌন গ্রামে ইসরায়েলি ‘ডাবল-ট্যাপ’ বা পরপর দুইবার হামলার ঘটনায় তার দলের তিন সদস্য নিহত হন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় লেবাননের অন্তত ১৩৫ জন উদ্ধারকর্মী ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী নিহত হয়েছেন।

সহকর্মীদের এই অকাল মৃত্যুতে সাফিউদ্দিন ভেঙে পড়েননি, বরং দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। জীবন রক্ষাকারী দলের সদস্যদের তিনি নিজের সন্তানের মতো দেখেন এবং তাদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রেখেছেন। তিনি বলেন, তার আর কোনো ভয় নেই। নিজের জীবন নয়, তিনি বরং সহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন।

সাফিউদ্দিন এখন তার দলের সদস্যদের নিয়ে পরবর্তী যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি আশা করেন, আল জাজিরার এই চলচ্চিত্র বিশ্ববাসীকে লেবাননের ওপর ইসরায়েলি আগ্রাসনের ভয়াবহ বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করবে। তার মতে, উদ্ধারকাজ ছেড়ে দেওয়া মানেই নিজের কন্যার স্মৃতি ও আত্মত্যাগের প্রতি অবজ্ঞা করা।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%