ইরানে কঠোর দমনপীড়ন ও মৃত্যুদণ্ড বৃদ্ধির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া

ইরানে চলমান অস্থিরতা ও রাষ্ট্রীয় কঠোরতার মুখে জননিরাপত্তা ব্যবস্থার নামে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ধরপাকড়, ফাঁসি এবং গণজমায়েতের স্থান বন্ধের মতো কঠোর কার্যক্রম। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার আবহে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করেছে কর্তৃপক্ষ। রাজধানী তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে ধর্মীয় নৈতিকতা পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে বাধ্যতামূলক হিজাব পালন, ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ওপর বিধিনিষেধ এবং ভিন্নমত দমনের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
জানুয়ারি মাসের সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে তেহরান একটি ‘অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। দেশটির সরকারি তথ্যানুযায়ী, ওই সময় বিক্ষোভে ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, নিহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই ঘটনাকে ‘অবিস্মরণীয় তিক্ত’ বলে মন্তব্য করলেও, তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে এই অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য সরাসরি দায়ী করেছেন।
বিচারিক প্রক্রিয়া ও মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রেও কর্তৃপক্ষ কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। ইসফাহানের আলিখানি স্কোয়ারে ২৮ জুলাই প্রকাশ্যে ক্রেনের সাহায্যে দুই যুবককে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ‘ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ও ‘পৃথিবীতে দুর্নীতি’ ছড়ানোর অভিযোগ আনা হয়েছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক জানিয়েছেন, ১৯ মার্চের পর থেকে অন্তত ৫৬ জনকে জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে ২৭ জন সরাসরি জানুয়ারি মাসের বিক্ষোভে জড়িত ছিলেন। এছাড়া শতাধিক ব্যক্তি বর্তমানে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকিতে রয়েছেন।
দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দাঙ্গাবাজদের বিরুদ্ধে দ্রুততম সময়ে শাস্তি কার্যকর করা একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। এদিকে অসলো-ভিত্তিক ইরান হিউম্যান রাইটস নামের একটি এনজিও জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ইরানে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার ৬৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে, যা ১৯৮৯ সালের পর সর্বোচ্চ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইসলামী বিপ্লবী আদালতে শুনানি হয় রুদ্ধদ্বার কক্ষে, যেখানে আসামিদের পরিবারের ওপর গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা না বলার জন্য প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হয়।
নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সরকার গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকে দীর্ঘ তিন মাস ইন্টারনেট সেবা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। বর্তমানে ইন্টারনেট চালু থাকলেও এর গতি অত্যন্ত ধীর এবং অধিকাংশ জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ওয়েবসাইট ব্লক করে রাখা হয়েছে। পাশাপাশি তেহরান, মাশহাদ, ইসফাহান ও রাশতসহ বিভিন্ন শহরে ‘ইসলামি রীতিনীতি’ না মানার অভিযোগে অসংখ্য ক্যাফে, রেস্তোরাঁ, জিম ও বইয়ের দোকান সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। শিক্ষক, লেখক, আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপরও রাষ্ট্রীয় নজরদারি ও গ্রেপ্তারের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
জাতিসংঘের সাতজন বিশেষজ্ঞ ও বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার গত সপ্তাহে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেছেন, বর্তমান আইনি কাঠামোয় রাষ্ট্রীয় সমালোচনা করা প্রায় অসম্ভব। তাদের মতে, দমন-পীড়ন দিয়ে ভিন্নমত দমানো সম্ভব নয়; বরং এই চক্রটি কেবল সমাজে ভীতি ছড়িয়ে ভবিষ্যতে বিক্ষোভের ঝুঁকি তৈরি করছে। তবে ইরানি সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের দাবি, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং শত্রুপক্ষের উস্কানি মোকাবিলায় এসব কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
