AdvertisementAdvertisement

হরমুজ প্রণালী নিয়ে অচলাবস্থা ও মার্কিন-ইরান উত্তেজনায় বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত এক চরম ও অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে উপনীত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে ১৭ জুন তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও বর্তমানে তা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীতে যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নৌ-অবরোধ এবং সামরিক উত্তেজনার ক্রমাগত হুমকি আন্তর্জাতিক বাজার ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে এক ভয়াবহ ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের মূল কেন্দ্রবিন্দু। সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার পর ইরান এই নৌপথটি প্রায় পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছে, যার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং জ্বালানি মূল্য আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে। ওমানের মধ্যস্থতায় বর্তমানে ৬০ দিনের জন্য একটি অস্থায়ী ট্রানজিট রুট তৈরির কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চললেও সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য সংকটের সমাধানকে মাসের পর মাস প্রলম্বিত করার আশঙ্কা তৈরি করেছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

মাঠ পর্যায়ে ওয়াশিংটন তাদের আগ্রাসী অবস্থান অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সম্প্রতি ৪৮টি বাণিজ্যিক জাহাজকে ভিন্ন পথে পরিচালিত করার পাশাপাশি দুটি জাহাজ তল্লাশি এবং অপর দুটিকে অকেজো করে দেওয়ার তথ্য জানিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একে ‘ইস্পাতের প্রাচীর’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তেহরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ অথবা একটি সমন্বিত চুক্তির আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্প সরাসরি হুশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বর্তমান আলোচনা তেহরানের জন্য চূড়ান্ত সুযোগ, অন্যথায় ধ্বংসাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে। তবে একই সময়ে মার্কিন অর্থ বিভাগ আইআরজিসির সাথে সংশ্লিষ্ট তিনটি এয়ারলাইন্সের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে ওয়াশিংটনের অভিপ্রায় নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।

সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাবি আল-জাজিরাকে বলেন, তেহরান বর্তমানে ওয়াশিংটনের দুর্বলতাগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে যুদ্ধের রাজনৈতিক ব্যয় এবং ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত ফুরিয়ে আসার মতো বিষয়গুলো ইরানের বিবেচনায় রয়েছে। তার মতে, ট্রাম্পের কঠোর হুশিয়ারি আসলে সরাসরি সামরিক হামলার চেয়ে মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টির কৌশল হিসেবেই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে সামরিক উত্তেজনার ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সরাসরি আলোচনার কথা অস্বীকার করলেও স্বীকার করেছেন যে, ওমানের সাথে গত দুই মাস ধরে অস্থায়ী নিরাপদ ট্রানজিট রুট তৈরির আলোচনা চলছে। অবরোধ এড়াতে বিকল্প পথ হিসেবে ইরানের বাণিজ্যমন্ত্রী সৈয়দ মোহাম্মদ আতাবাক পাকিস্তান সফর করেছেন। আরব সেন্টার ফর ইরানিয়ান স্টাডিজের পরিচালক মোহাম্মদ সাদেঘিয়ানের মতে, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল, কারণ একদিকে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় ফেরার আশা রয়েছে, অন্যদিকে ট্রাম্প যেকোনো সময় আলোচনার টেবিল উল্টে দিয়ে নতুন করে যুদ্ধ শুরুর ঝুঁকি তৈরি করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্পষ্ট অবস্থান হলো, হরমুজ প্রণালীর বাণিজ্যিক চলাচলের নিয়ন্ত্রণ কোনোভাবেই ইরানের হাতে থাকতে পারবে না, কারণ যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট জ্বালানির ২০ শতাংশ এই পথ দিয়ে প্রবাহিত হতো। কুয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফয়সাল আবু সুলাইব সতর্ক করেছেন যে, যদি কোনো চুক্তির মাধ্যমে ইরানকে এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রক বা ‘গেটকিপার’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে তা যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য অগ্রহণযোগ্য হবে। বিশ্লেষকদের মতে, ইরান বর্তমানে এই প্রণালীকে কেবল আলোচনার বিষয়বস্তু নয়, বরং নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও অবরোধ উত্তোলনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%