ইথিওপিয়ার তিগ্রাই অঞ্চলে সংঘাতের পুনরাবৃত্তি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির চরম মূল্য দিচ্ছে বেসামরিক জনগণ

ইথিওপিয়ার তিগ্রাই অঞ্চলে পুনরায় শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী সংঘাত সাধারণ মানুষের জীবনকে নতুন করে সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর বিচার না হওয়া এবং দায়মুক্তির সংস্কৃতিই নতুন করে এই অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর যে প্রত্যাশার সঞ্চার হয়েছিল, তা এখন চরম হতাশায় পর্যবসিত হয়েছে।
শান্তি চুক্তির পর পুনর্গঠন ও ন্যায়বিচারের যে স্বপ্ন সাধারণ মানুষ দেখেছিল, তা কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে। অ্যামনেস্টির ভাষ্যমতে, আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলো যেসব নৃশংসতার তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ করেছিল, সেগুলোর তদন্তে কর্তৃপক্ষ কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। বরং আন্তর্জাতিক তদন্ত সংস্থাগুলোর মেয়াদ শেষ হতে দেওয়া হয়েছে এবং সরকার প্রস্তাবিত ট্রানজিশনাল জাস্টিস বা অন্তর্বর্তীকালীন বিচার প্রক্রিয়া কার্যত পরিত্যক্ত হয়েছে। যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগগুলো বিচারহীনতার অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যাওয়ায় অপরাধীরা নতুন করে সহিংসতার সাহস পাচ্ছে।
চলতি বছরের আগস্ট মাসের শুরুতে তিগ্রাই বাহিনী এবং ইথিওপিয়ান ন্যাশনাল ডিফেন্স ফোর্সের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। অ্যামনেস্টি সতর্ক করে জানিয়েছে যে, আগের যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে অঞ্চলটি এখনো পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। এমতাবস্থায় নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়াটা মূলত দায়মুক্তির ভয়াবহ পরিণতিরই প্রতিফলন। তিগ্রাইয়ের পাশাপাশি আমহারা ও ওরোমিয়া অঞ্চলেও মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঘটনা ঘটছে, যা ইথিওপিয়ার সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে।
২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত চলা যুদ্ধের সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, যৌন সহিংসতা এবং জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির মতো অসংখ্য অমানবিক ঘটনার নথিপত্র রয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর কাছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, স্বাধীন তদন্ত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচারের অনুপস্থিতি অপরাধীদের একটি বিপজ্জনক বার্তা দিয়েছে যে, যত বড় অপরাধই করা হোক না কেন, তার জন্য কোনো সাজা পেতে হবে না। আন্তর্জাতিক তদারকি দুর্বল হয়ে পড়ায় এবং জাতিসংঘের তদন্ত প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় বর্তমানে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
সংঘাতের নতুন ঢেউ শুরু হওয়ার আগেই তিগ্রাই অঞ্চলে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ, জোরপূর্বক সৈন্য নিয়োগ এবং চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের মাধ্যমে পরিস্থিতির অবনতি ঘটছিল। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ইথিওপিয়ার ফেডারেল সরকার ও তিগ্রাই কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে যেন তারা অবিলম্বে আন্তর্জাতিক মানবিক আইন মেনে চলে এবং সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। মানবাধিকার পর্যবেক্ষক, আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থা এবং নিরপেক্ষ সংবাদমাধ্যমের জন্য দুর্গত এলাকাগুলো উন্মুক্ত করে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংস্থাটি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
