শেখ হাসিনার রাজনৈতিক বক্তব্য নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে নতুন কূটনৈতিক উত্তেজনা

ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্য এবং রাজনৈতিক উসকানিতে লিপ্ত হওয়ার দায়ে বাংলাদেশ সরকার তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সেই সঙ্গে শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রয়োগ নিশ্চিত করার বিষয়ে ভারতের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে ঢাকা।
বুধবার সন্ধ্যায় ভারতের নয়াদিল্লিতে ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়ার আয়োজনে একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা যোগ দিলে পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। এই অনুষ্ঠানে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী এবং ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানও অংশ নেন। অনুষ্ঠানটি আয়োজনের আগে বাংলাদেশ সরকার ভারত প্রশাসনের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছিল যেন শেখ হাসিনাকে সে দেশের মাটি ব্যবহার করে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হতে না দেওয়া হয়। এ বিষয়ে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠক করলেও কোনো কার্যকর সুরাহা হয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছেন যে, শেখ হাসিনার ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং এর দায়ও দিল্লির নয়। তবে এই ভাষ্যকে পাত্তা দিচ্ছে না ঢাকা। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, জুলাই বিপ্লবের বার্ষিকীতে ভারতের মাটিতে বসে এ ধরনের উসকানিমূলক বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের শামিল। মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে যে তদন্ত চলছে, তা অস্বীকার করার চেষ্টা মূলত ইতিহাস বিকৃতির অপপ্রয়াস।
এদিকে, শেখ হাসিনাকে দেশে ফেরানোর বিষয়ে ২০১৩ সালের বাংলাদেশ-ভারত প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতাভুক্ত প্রক্রিয়া নিয়ে ভারত এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সাড়া দেয়নি। বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এ ঘটনায় দুই দেশের পারস্পরিক আস্থার সংকটের পাশাপাশি ভারতের পররাষ্ট্রনীতির দ্বৈততাও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।
জাতীয় অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহর মতে, একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ও পলাতক ব্যক্তির রাজনৈতিক বক্তব্য জনগণের কাছে কোনো নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা রাখে না। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, শেখ হাসিনাকে অবশ্যই দেশের বিদ্যমান আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আসতে হবে, কারণ তার বর্তমান বক্তব্যের সঙ্গে অতীতের শাসনামলের বাস্তবতার কোনো যোগসূত্র নেই। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শাহিদুজ্জামান মনে করেন, প্রতিবেশী দেশের এ ধরনের আচরণ দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে কোনো কোনো বিশ্লেষক এ বিষয়টিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন। সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদের ভাষ্যমতে, জনগণের সমর্থনই শেষ পর্যন্ত যেকোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। তবে বিশেষজ্ঞরা একমত যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের কার্যকর ও গঠনমূলক কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সব মিলিয়ে শেখ হাসিনার এই রাজনৈতিক তৎপরতা দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান আস্থার সম্পর্কে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
