AdvertisementAdvertisement

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত ও আকাশসীমায় অস্থিরতা: বৈশ্বিক পর্যটন খাতে বড় সংকট ও ভ্রমণকারীদের উদ্বেগ

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের উত্তাপ সরাসরি পর্যটন শিল্পে আঘাত হেনেছে। আকাশপথে নিরাপত্তার খাতিরে বিশাল এলাকা জুড়ে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল বন্ধ বা পথ পরিবর্তন করতে বাধ্য হওয়ায় বিশ্বজুড়ে ভ্রমণকারী পরিবার ও পর্যটন সংস্থাগুলো চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বৈশ্বিক এই অস্থিরতায় আকাশপথে বাড়তি সময় ব্যয়, জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং ফ্লাইট সূচিতে ঘন ঘন পরিবর্তনের ফলে সাধারণ মানুষের বিদেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা ওলটপালট হয়ে গেছে।

লন্ডন থেকে বালিতে সপরিবারে ছুটি কাটাতে যাওয়া নাদিয়া ওয়ালিদ জানান, ইরান পরিস্থিতির কারণে এমিরেটস এয়ারলাইনস শেষ মুহূর্তে ফ্লাইট সূচিতে বারবার পরিবর্তন এনেছে। এতে দুবাইয়ে তার তিন ঘণ্টার যাত্রাবিরতি বেড়ে ১৮ ঘণ্টায় দাঁড়ায়। এমন ভোগান্তি কেবল নাদিয়ার নয়, বরং বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার পর্যটক এখন একই পরিস্থিতির শিকার। পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ, ভার্জিন আটলান্টিকসহ একাধিক বড় এয়ারলাইনস দুবাই, দোহা ও তেল আবিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোর ফ্লাইট স্থগিত বা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

ভ্রমণ সংস্থা ‘ট্রেইলফাইন্ডারস’ জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা এড়িয়ে চলার নির্দেশ আসায় হাজার হাজার বুকিং বাতিল বা পুনর্বিন্যাস করতে হয়েছে তাদের। বর্তমান পরিস্থিতিতে পর্যটকদের ঝোঁক এখন ঘরের কাছে ইউরোপের দেশগুলোর দিকে। টিইউআই-এর মুখপাত্র আগে ডুনহপ্টের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপীয় পর্যটকদের ৭৫ শতাংশই এখন ইতালি, স্পেন, গ্রিস ও নরওয়ের মতো গন্তব্যগুলো বেছে নিচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে পর্যটকরা অনিশ্চয়তা এড়াতে অতিরিক্ত অর্থ খরচ করেও ‘প্যাকেজ হলিডে’ বুকিংকে প্রাধান্য দিচ্ছেন, কারণ সেখানে সুরক্ষার নিশ্চয়তা থাকে।

পাইলট ও এয়ারলাইনস কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, সংঘাতপূর্ণ এলাকা এড়িয়ে নতুন রুটে উড়োজাহাজ পরিচালনা করতে গিয়ে গড়ে অতিরিক্ত ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগছে। এর ফলে প্রতিটি ফ্লাইটে ২,৫০০ থেকে ৭,০০০ কেজি জ্বালানি অতিরিক্ত খরচ হচ্ছে। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের পাইলট ময়েজ হামিদ সতর্ক করে বলেন, অপরিচিত নতুন পথে দীর্ঘ সময় ও বাড়তি চাপের কারণে পাইলটদের ক্লান্তি বাড়ছে, যা পরোক্ষভাবে ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে জিপিএস জ্যামিং ও সামরিক অস্থিরতার কারণে এয়ারলাইনসগুলো বর্তমানে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

এই সংকট পর্যটননির্ভর দেশগুলোর অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো, যারা ইউরোপীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল, তারা ভয়াবহ ক্ষতির শিকার হচ্ছে। শিল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সামগ্রিকভাবে গ্রীষ্মকালীন পর্যটন বুকিং ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। পর্যটন ব্যবসায়ী জাঁ-মার্ক ফ্লামবার্টের মতে, এই প্রভাব এখন কোভিড-১৯ মহামারির শুরুর দিকের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। অনেক দেশেই পর্যটকের অভাবে স্থানীয় অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়েছে।

শেষ পর্যন্ত পর্যটকদের বড় একটি অংশ এখন ঝুঁকিহীন গন্তব্য খুঁজছেন অথবা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করছেন। যারা তবুও দীর্ঘ ভ্রমণে বের হচ্ছেন, তারা অনিশ্চয়তার বিমা বা প্যাকেজ বুকিংয়ের মাধ্যমে নিজেদের সুরক্ষিত রাখার চেষ্টা করছেন। তবে পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটের আসল ক্ষতিটা সেই দেশগুলো বহন করছে, যারা পর্যটন খাতের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হলেও, একটি দেশের পর্যটন অর্থনীতির ওপর পড়া এই দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব কাটিয়ে উঠতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%