গাজায় ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার ১১২ স্বজনের গণকবর সম্পন্ন

গাজার সাবরা এলাকায় এক হৃদয়বিদারক ও নজিরবিহীন গণকফনের সাক্ষী হলো ফিলিস্তিনিরা। দীর্ঘ তিন বছরের প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত আবু শ্রেয়া এবং আল-হাসাইনা পরিবারের ১১২ জন সদস্যের দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার গাজা সিটির এই এলাকায় আয়োজিত স্মরণকালের বৃহত্তম এই শেষ বিদায় অনুষ্ঠানে হাজারো শোকাতুর মানুষ জড়ো হন। ২০২৩ সালের নভেম্বরে পরিচালিত সেই ভয়াবহ হামলায় এই দুই পরিবারের বহু মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছিলেন, যাদের দেহাবশেষ সম্প্রতি উদ্ধার করতে সক্ষম হন ফিলিস্তিনের সিভিল ডিফেন্স কর্মীরা।
এই ট্র্যাজেডিতে পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে হারানো ৩৯ বছর বয়সী লারা আবু শ্রেয়া জানান, প্রিয়জনদের চিরবিদায় জানানোর এই মুহূর্তটি তার কাছে নতুন করে প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণার মতো মনে হয়েছে। তিনি বলেন, তার মা নাওয়াল এবং আট ভাই-বোনসহ পরিবারের প্রায় সবাই ওই হামলায় মুহূর্তের মধ্যে হারিয়ে যান। যুদ্ধের শুরুতে লারা তার স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে গাজার দক্ষিণে আশ্রয় নিলেও, তার অন্য স্বজনরা সাবরা এলাকাতেই থেকে গিয়েছিলেন। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধারের অপেক্ষায় থাকা সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা স্মরণ করে তিনি আজও শিউরে ওঠেন।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল জানান, ফিলিস্তিনের ইতিহাসে এটিই প্রথমবারের মতো এত বিশাল সংখ্যক মানুষকে একযোগে দাফন করা হলো। তিনি আরও জানান, ধ্বংসের ব্যাপকতা এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাব সত্ত্বেও উদ্ধারকাজ চলছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গাজার বিভিন্ন ভবনের নিচে এখনো প্রায় ৮ হাজার দেহাবশেষ চাপা পড়ে আছে। অনেক ক্ষেত্রেই দেহাবশেষ শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে, কারণ তীব্র বিস্ফোরণের আঘাতে অনেক শরীর ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে অথবা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।
আরেক স্বজন ৫০ বছর বয়সী আলী আবু শ্রেয়া জানান, মাত্র দুই ঘণ্টার ব্যবধানে আবু শ্রেয়া এবং আল-হাসাইনা পরিবারের সাতটি বংশ একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। হামলায় ক্ষতিগ্রস্তরা নিরাপত্তার খোঁজে সাবেক মন্ত্রী মুফিদ আল-হাসাইনার বাড়িতে আশ্রয় নিলেও যুদ্ধংদেহী ইসরায়েলি বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পাননি। সাধারণ ব্যবসায়ী ও সমাজকর্মী এসব মানুষ কোনোভাবেই এই লড়াইয়ের লক্ষ্যবস্তু হওয়ার কথা ছিল না।
দাফন অনুষ্ঠানে আসা পুরুষ ও বয়োজ্যেষ্ঠরা অশ্রুসিক্ত চোখে যখন কফিনবাহী মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন আশেপাশের বারান্দা থেকে নারীরা তাদের ওপর ফুল ছিটিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান। লারার কাছে এই দাফন শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এক বিচ্ছেদের চূড়ান্ত পরিণতি। তিনি বলেন, শেষবারের মতো প্রিয়জনদের স্পর্শ করার সুযোগটুকুও তার কাছে ছিল এক বড় প্রাপ্তি, যদিও এই শোকের কোনো সান্ত্বনা নেই।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
