মরক্কো ও স্পেনের দীর্ঘস্থায়ী ভূখণ্ড বিবাদে উত্তপ্ত সেউতা ও মেলিয়া

উত্তর আফ্রিকার উপকূলবর্তী স্পেনের দুটি ছোট ছিটমহল সেউতা ও মেলিয়া দীর্ঘকাল ধরে মাদ্রিদ ও রাবাতের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মরক্কোর সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলগুলো আফ্রিকান ভূখণ্ডে অবস্থিত ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র ছিটমহল। কেবল সেউতা ও মেলিয়াই নয়, মরক্কোর উপকূলের অদূরে অবস্থিত কিছু পাথুরে দ্বীপপুঞ্জও স্পেনের নিয়ন্ত্রণাধীন, যা ঐতিহাসিকভাবেই দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক জটিল সমীকরণ তৈরি করেছে। ১৯৫৬ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর থেকেই মরক্কো এই ভূখণ্ডগুলোর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে, যা স্পেন বরাবরই প্রত্যাখ্যান করেছে।
সম্প্রতি স্পেনের সেউতা সীমান্তে প্রায় ৫০ হাজার অভিবাসীর আকস্মিক অনুপ্রবেশের ঘটনায় দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। যদিও তাদের অধিকাংশকে ইতিমধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তবে কয়েক হাজার অভিবাসী এখনো সেখানে অবস্থান করছে। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে, সেউতা ও মেলিয়া স্পেনের ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের শেষ স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে টিকে আছে। সেউতা ১৪১৫ সালে পর্তুগালের দখলে এলেও ১৫৮০ সালে তা স্পেনের অধীনে চলে যায়। অন্যদিকে, ১৪৯৭ সালে এক স্পেনীয় অভিজাতের বিজয়ের মাধ্যমে মেলিয়া স্পেনের নিয়ন্ত্রণে আসে। আফ্রিকার বিউপনিবেশায়নের যুগেও এই অঞ্চলগুলো স্পেনের অধীনে রয়ে যাওয়ায় এগুলোকে অনেক ক্ষেত্রে একটি ‘ঐতিহাসিক অসংগতি’ হিসেবে দেখা হয়।
স্পেনের দাবি, এই ছিটমহলগুলো তাদের ভূখণ্ড এবং এগুলো ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহিঃসীমানার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বার্সেলোনার আইএমএফ-সিএসআইসি-এর নৃতত্ত্ববিদ ইয়োলান্দা আইক্সালা ক্যাব্রের মতে, প্রতীকী অর্থে এই ছিটমহলগুলোর অস্তিত্ব স্পেনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা তাদের সাম্রাজ্যবাদী অতীত ও শ্রেষ্ঠত্বকে ধারণ করে। তবে মরক্কোর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ইতিহাসবিদদের মতে, এই অঞ্চলগুলোর ওপর মরক্কোর দাবি ঐতিহাসিক ও ভৌগোলিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। গবেষক সেলিম বালুয়াতি লাকলুফির মতে, এই অঞ্চলগুলো আধুনিক মরক্কো রাষ্ট্রের অস্তিত্বের অনেক আগে থেকেই সেখানে অবস্থান করছে এবং মরক্কোর রাজনৈতিক শ্রেণি এটিকে স্পেনের বিরুদ্ধে এক কার্যকর কূটনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে।
আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে এই দাবির প্রকৃতি রাজনৈতিক, ঠিক যেমনটা জিব্রাল্টারকে ঘিরে ব্রিটেন ও স্পেনের বিরোধ। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিশেষজ্ঞ জেমি ত্রিনিদাদ উল্লেখ করেছেন, আন্তর্জাতিক আইনে এই দাবিগুলোর ভিত্তি কিছুটা দুর্বল এবং জাতিসংঘও এর আগে সেউতা ও মেলিয়াকে বিউপনিবেশায়ন তালিকার অন্তর্ভুক্ত করার মরক্কোর অনুরোধ আমলে নেয়নি। বর্তমানে সেউতা ও মেলিয়ায় যথাক্রমে ৮৪ হাজার ও ৮৬ হাজার মানুষের বসবাস। সেখানে খ্রিস্টান, মুসলিম, ইহুদি ও হিন্দুসহ নানা ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সহাবস্থান থাকলেও সাম্প্রতিক অভিবাসী সংকট এই সামাজিক ভারসাম্যে কিছুটা চিড় ধরিয়েছে।
সেউতা ও মেলিয়ার বাসিন্দাদের বড় একটি অংশ, এমনকি মরক্কী বংশোদ্ভূত নাগরিকদের মধ্যেও স্পেনের অংশ হিসেবে থাকার আকাঙ্ক্ষা প্রবল। এর পেছনে মূলত উন্নত জীবনযাত্রা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পার্থক্যের বড় প্রভাব রয়েছে। স্পেনের সরকারি নথি অনুযায়ী, এই অঞ্চলগুলো শেনজেন এলাকার অন্তর্ভুক্ত হলেও সেখানে যাতায়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ কঠোর নিরাপত্তা ও নথিপত্র যাচাইয়ের নিয়ম কার্যকর রয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অভিবাসন বা নিরাপত্তা সহযোগিতার ক্ষেত্রে কৌশলগত কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। তবে স্পেনের সার্বভৌমত্ব বা দীর্ঘদিনের অবস্থানে বড় কোনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না বিশ্লেষকরা।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
