সুইতায় গণঅভিবাসন ও প্রাণহানি ঘিরে ইউরোপীয় ইউনিয়নে তীব্র মতভেদ ও কূটনৈতিক সংকট

উত্তর আফ্রিকার স্পেনীয় ছিটমহল সেউতায় গত সপ্তাহে হাজার হাজার অভিবাসীর আকস্মিক অনুপ্রবেশকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও স্পেনের অভ্যন্তরে তীব্র রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। গত বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার ৬০ হাজারেরও বেশি মানুষ সমুদ্রপথে এই ছিটমহলে প্রবেশ করলে সেখানে এক ভয়াবহ মানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। স্পেনীয় ও মরক্কোর কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, এই উত্তাল যাত্রাপথে সমুদ্রের পানিতে ডুবে এবং ধাক্কাধাক্কিতে পদদলিত হয়ে ৮০ জনেরও বেশি অভিবাসীর মৃত্যু হয়েছে। স্পেনীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফার্নান্দো গ্রান্দে-মারলাস্কা জানিয়েছেন, বর্তমানে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এসেছে এবং অনুপ্রবেশ করা অভিবাসীদের প্রায় সবাই মরক্কোতে ফিরে গেছেন।
সেউটার এই ঘটনাকে ঘিরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অভিবাসন নীতি নিয়ে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য আবারও প্রকট হয়ে উঠেছে। আয়ারল্যান্ডের আহ্বানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের একটি জরুরি ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে ২৭টি সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ২২টি রাষ্ট্র বহিঃসীমানা সুরক্ষা জোরদার ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তবে এই সংকট মোকাবেলায় স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছেন। ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি স্পেনের সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করে স্পেনের সঙ্গে সাময়িকভাবে আকাশ ও সমুদ্রপথে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দিয়েছেন।
সানচেজ এই সমালোচনা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে একে ইউরোপীয় আইন ও মানবিক সংহতির পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তথ্য তুলে ধরে দাবি করেন, ২০২১ সাল থেকে স্পেন ২ লাখ ৩৪ হাজার অভিবাসী গ্রহণ করলেও ইতালিতে এই সংখ্যা ৪ লাখ ৭৮ হাজার। স্পেনের সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করছেন, স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের একটি রায়কে পাচারকারীরা ভুলভাবে উপস্থাপন করায় এই জনস্রোতের সৃষ্টি হয়। স্পেনের সুপ্রিম কোর্টের ওই রায়ে বলা হয়েছিল, সমুদ্রপথে আসা অভিবাসীদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া ফেরত পাঠানো যাবে না।
এদিকে, ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্টেক্সের তথ্যমতে, ২০১৫ সালে ১৮ লাখ অনিয়মিত অভিবাসী ইউরোপে প্রবেশ করলেও ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে এই সংখ্যা ৩৭ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ৪৯ হাজারে নেমে এসেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইতোমধ্যে অভিবাসন ও আশ্রয়ের ক্ষেত্রে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে অভিবাসীদের আটক রাখার ও তৃতীয় দেশে ফেরত পাঠানোর বাড়তি ক্ষমতা দিয়েছে। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করে জানিয়েছে, এই কঠোর পদক্ষেপের ফলে আশ্রয়প্রার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন আটককেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছেন।
মরক্কোর এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এএফপিকে জানিয়েছেন, স্পেনের আদালতের ওই রায়ের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তারা আগেই সতর্ক করেছিলেন। তিনি অভিবাসন প্রত্যাশীদের ঠেকাতে কেবল বলপ্রয়োগের ধারণাকে খণ্ডন করে বলেছেন, বিষয়টি অত্যন্ত জটিল এবং এর পেছনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যের বড় ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ তুলেছেন যে, ডানপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলো তাদের অভিবাসনবিরোধী এজেন্ডা বাস্তবায়নে সেউটার এই মানবিক বিপর্যয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
