ইরানের হামলায় রাশিয়ার গোয়েন্দা সহায়তার সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ বাড়ছে

ফিলিপাইনের ম্যানিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের সম্মেলনের ফাঁকে গত বৃহস্পতিবার মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এবং রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ আলোচনার শীর্ষে থাকলেও, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় ইরানের হামলায় রাশিয়ার সক্রিয় সম্পৃক্ততার নতুন তথ্য পুরো পরিস্থিতিকে এক জটিল মোড় দিয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, সৌদি আরবে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) স্থাপনায় ইরানি ড্রোন হামলার ধরন ও লক্ষ্যভেদের নিখুঁত সক্ষমতা দেখে মার্কিন গোয়েন্দারা রাশিয়ার সহায়তার বিষয়টি তদন্ত করছেন।

বিজ্ঞাপন

গত মার্চ মাসের শুরুতে যুদ্ধের কয়েক দিনের মধ্যেই ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল যে, রিয়াদে মার্কিন দূতাবাসের একটি সিআইএ স্টেশন লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। এর পরপরই সিএনএন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানায়, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন জনবল ও আকাশযানের অবস্থান চিহ্নিত করতে তেহরানকে সহযোগিতা করছে মস্কো। প্যারিসের সায়েন্সেস পো বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক নিকোল গ্রাজেউস্কি আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মন্তব্য করেন, ইরানের সাম্প্রতিক হামলাগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত ও প্রযুক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ। রাশিয়ার মতো মহাকাশভিত্তিক নজরদারি সক্ষমতা ইরানের না থাকায়, রুশ গোয়েন্দা তথ্যের ওপর তেহরানের নির্ভরশীল হওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত বাস্তবসম্মত।

ইউক্রেন যুদ্ধের পর থেকে মস্কো ও তেহরানের সামরিক সম্পর্ক এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। গত বছর উভয় দেশ ২০ বছর মেয়াদী একটি কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যা প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে আরও সুসংহত করেছে। যদিও রুশ উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রে রুদেনকো সে সময় দাবি করেছিলেন যে, এই চুক্তি কোনো সামরিক জোট নয়, তবুও যুদ্ধক্ষেত্রে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রে রুশ প্রযুক্তির উপস্থিতি নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে, সাইপ্রাসে ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের ঘাঁটিতে হামলায় বিধ্বস্ত শাহেদ-১৩৬ ড্রোনে রাশিয়ার কোমেতা-এম অ্যান্টি-জ্যামিং নেভিগেশন সিস্টেম পাওয়ার বিষয়টি মস্কোর সরাসরি সহায়তার অভিযোগকে জোরালো করেছে। যদিও ক্রেমলিন এই অভিযোগকে ‘ভুয়া সংবাদ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতকে মস্কো মার্কিন শক্তির বিশ্বব্যাপী প্রভাব ক্ষুণ্ন করার এক মোক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখছে। ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বৈশ্বিক দৃষ্টি সরিয়ে নেওয়া এবং মার্কিন মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যে ব্যস্ত রাখার কৌশল হিসেবে রাশিয়ার এই পরোক্ষ সমর্থন কাজ করছে। তবে গ্রাজেউস্কি মনে করেন, রাশিয়ার সহায়তা ইরানের জন্য বাড়তি সুবিধা দিলেও, এটিই একমাত্র নির্ধারক নয়। ইরানের নিজস্ব দীর্ঘদিনের তৈরি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার এবং মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা নেটওয়ার্কই মূলত বর্তমান যুদ্ধের মূল চালিকাশক্তি।

বিজ্ঞাপন

এদিকে, বৃহস্পতিবার ভোরে ইরাক সীমান্তের শালামচেহ ক্রসিংয়ে মার্কিন হামলায় অন্তত ২ জন নিহত হয়েছেন। টানা ১২তম দিনের মতো চলমান এই পাল্টাপাল্টি হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি চরম উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। জর্ডান ও উপসাগরীয় বিভিন্ন দেশে ইরানের পাল্টা আঘাতের ঘটনায় পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক মহলের নজর এখন ওয়াশিংটন ও তেহরানের এই তীব্র সংঘাতের পরিণতির দিকে, যেখানে রাশিয়ার ভূমিকা পর্দার আড়ালে এক রহস্যময় প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%