ইরানের বেসামরিক অবকাঠামোয় মার্কিন হামলা তীব্রতর, যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাত এক নতুন ও উদ্বেগজনক মোড়ে উপনীত হয়েছে। গত ছয় রাত ধরে টানা বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন বাহিনী, যার লক্ষ্যবস্তু এখন কেবল সামরিক স্থাপনাতেই সীমাবদ্ধ নেই। তেহরানের অভিযোগ, ওয়াশিংটন ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। রেলপথ, সেতু, পানির প্রকল্প এবং খাদ্য গুদামের মতো অতি প্রয়োজনীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনায় জনজীবনে চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে ইরানের জ্বালানি খাতকে টার্গেট করা হবে, যা অঞ্চলটিতে যুদ্ধ পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

বিজ্ঞাপন

সংঘাতের এই তীব্রতা ছড়িয়ে পড়েছে পুরো পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে। ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, বাহরাইনের একটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে তারা সফল হামলা চালিয়েছে। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং জর্ডান তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এপ্রিল মাসে একটি অস্ত্রবিরতি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল। তবে উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলায় শান্তি আলোচনার পথ এখন পুরোপুরি রুদ্ধ।

বন্দর আব্বাসের মতো কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো এখন হামলার প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। বন্দর আব্বাসের কাহুরেস্তান সেতু ও সংলগ্ন আবাসিক এলাকায় মার্কিন হামলায় অন্তত ২ জন নিহত এবং ৮ জন আহত হয়েছেন। হরমুজগান প্রদেশের প্রাদেশিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, কেবল তাদের এলাকাতেই অন্তত ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সেতু ধ্বংস হয়েছে, যা দক্ষিণাঞ্চলের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আহভাজের বাঘাই বিশেষায়িত হাসপাতালটিও হামলার শিকার হয়েছে, যার ফলে ২০০ জনেরও বেশি রোগীকে জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নিতে হয়েছে। মিনাবের শাজারেহ তায়্যেবেহ বালিকা বিদ্যালয়ে ভয়াবহ বিমান হামলায় অন্তত ১৫০ জন নিহত হওয়ার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করার দাবি তুলেছে।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এই হামলাকে জাতিসংঘের সনদ ও আন্তর্জাতিক আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেছেন, বেসামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়ে ওয়াশিংটন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ সংঘটন করছে। তবে পেন্টাগন ও সেন্টকমের দাবি, এসব স্থাপনা ‘দ্বৈত ব্যবহারের’ উপযোগী, অর্থাৎ বেসামরিক হওয়ার পাশাপাশি এগুলো সামরিক কাজেও ব্যবহৃত হয়। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন বাহিনীর এই কৌশলের পেছনে দুটি মূল লক্ষ্য থাকতে পারে—প্রথমত, হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও রসদ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে দেওয়া; দ্বিতীয়ত, প্রচণ্ড সামরিক ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে তেহরানকে পুনরায় আলোচনার টেবিলে বাধ্য করা।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাজ্যের কিংস কলেজ লন্ডনের নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ মার্ক হিলবোর্ন মনে করেন, এই হামলাগুলো ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমানোর পাশাপাশি একটি বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে কাজ করছে। অনেক বিশ্লেষক সতর্ক করেছেন যে, অবকাঠামো ধ্বংসের এই ধারা হয়তো স্থল অভিযানের প্রস্তুতির ইঙ্গিত দিচ্ছে, যদিও তা অঞ্চলটির জন্য চরম বিপর্যয় ডেকে আনবে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে কোনো দেশকেই আলোচনার টেবিলে দীর্ঘমেয়াদে বসানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা। উল্টো ওয়াশিংটনের এই নীতি ইরানের জনগণের মধ্যে মার্কিনবিরোধী মনোভাবকে আরও সংহত করছে, যা শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে আরও জটিল করে তুলছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%