ইরানের দ্বীপ দখলে যুক্তরাষ্ট্রের সক্ষমতা ও ঝুঁকির সমীকরণ নিয়ে বিশ্লেষকদের উদ্বেগ

ইরানের দক্ষিণ উপকূলীয় বন্দর শহর বন্দর আব্বাসসহ দেশটির কেশম, কিশ এবং আবু মুসা দ্বীপে মার্কিন বাহিনীর সাম্প্রতিক দফায় দফায় হামলা নতুন করে এক বড় ভূ-রাজনৈতিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ওয়াশিংটন কি তবে ইরানের ভূখণ্ড দখলের প্রস্তুতি নিচ্ছে? এমন প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সোমবার ফক্স নিউজে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এই সম্ভাবনা উড়িয়ে না দেওয়ায় বিষয়টি আরও ঘনীভূত হয়েছে।
গত মার্চ মাসে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর থেকে খারগ দ্বীপে অভিযানের পরিকল্পনার কথা ফাঁস হওয়ার পর থেকেই এ বিষয়ে জল্পনা তুঙ্গে। খারগ দ্বীপটি ইরানের অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশের কেন্দ্রস্থল। যদিও জুনের মাঝামাঝি সময়ে উভয় পক্ষের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর অভিযানের গুঞ্জন কিছুটা স্তিমিত হয়েছিল, তবে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যে ফের তা আলোচনার টেবিলে ফিরে এসেছে। অভিযানের বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে ট্রাম্প বলেন, এ ধরনের বিষয়ে খোলাসা করা বোকামি হবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস ক্রিয়েগের মতে, কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ছোট কোনো ইরানি দ্বীপ দখল করার সামরিক সক্ষমতা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে প্রায় ৫০ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে, যারা বড় ঘাঁটি থেকে শুরু করে ছোট চৌকিতে কর্মরত। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, কোনো দ্বীপ সাময়িকভাবে দখল করা আর তা ধরে রেখে কৌশলগত সুবিধা আদায় করা এক বিষয় নয়। বিশেষ করে কেশমের মতো বড় দ্বীপ, যা মূল ভূখণ্ডের খুব কাছে অবস্থিত, তা দখল ও নিয়ন্ত্রণ রাখা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্য রাজনীতি বিষয়ক অধ্যাপক নাদের হাশেমির মতে, ইরানের ভূখণ্ড দখলের ধারণাটি মূলত তাত্ত্বিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই ধরনের কোনো অভিযান কেবল রাজনৈতিক ঝুঁকিই বাড়াবে না, বরং এটি ইরাক যুদ্ধের মতো পরিস্থিতির অবতারণা করতে পারে, যা খোদ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্পের অবস্থানের জন্য বড় আঘাত হয়ে দাঁড়াবে। এছাড়া ইরান সহজেই দ্বীপগুলোকে তাদের মূল ভূখণ্ড থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে পারে, যা মার্কিন সেনাদের ক্রমাগত হুমকির মুখে রাখবে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা মূলত ভ্রাম্যমাণ ও গোপন অবস্থানে রয়েছে, যা শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিরবচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো অভিযান শুরু হলেও, তা শেষ পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদী স্থলযুদ্ধে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা প্রবল। এতে করে একদিকে যেমন মার্কিন বাহিনী একটি বড় ধরনের ভূখণ্ড দখলের ফাঁদে আটকে পড়বে, অন্যদিকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরানের সাথে সংঘাতের মাত্রা চরম আকার ধারণ করবে।
সবশেষে, বিশেষজ্ঞরা একমত যে দ্বীপ দখলের নাটকীয় সামরিক প্রদর্শনী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো টেকসই সমাধান বয়ে আনবে না। বরং এটি মুক্ত নৌ-চলাচলের লড়াইকে একটি দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপান্তরিত করবে। ইরান এই দখলকে উসকানি হিসেবে গণ্য করে খনি (মাইন) স্থাপনসহ উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামো এবং মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে পাল্টা হামলা জোরদার করতে পারে, যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দেবে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা