ভারতে ই২০ জ্বালানি নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে গাড়ির কার্যক্ষমতা হ্রাস ও যান্ত্রিক ত্রুটির আশঙ্কায়

ভারতের জ্বালানি বাজারে ২০ শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রোল বা ‘ই২০’ বাধ্যতামূলক করার সরকারি সিদ্ধান্ত দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার দ্রুত জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং অপরিশোধিত তেল আমদানি হ্রাসের লক্ষ্যে এই উদ্যোগ গ্রহণ করলেও, সাধারণ গাড়িচালকদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। অনেক গ্রাহকই অভিযোগ করছেন, নতুন এই জ্বালানি ব্যবহারের ফলে গাড়ির মাইলেজ বা জ্বালানি দক্ষতা উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে এবং ইঞ্জিনের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।
নয়াদিল্লির বাসিন্দা ব্যাংক কর্মকর্তা কৃষ্ণ কুমার জানান, ই২০ জ্বালানি ব্যবহারের পর তার ব্যক্তিগত গাড়ির গতি ও মাইলেজে বড় ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করেছেন তিনি। আগে তার গাড়ি প্রতি লিটারে ১৮ থেকে ২০ কিলোমিটার চললেও এখন তা ১৬ থেকে ১৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছে। কেবল মাইলেজই নয়, বিশেষ করে পাহাড়ি রাস্তায় গাড়ি চালানো কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু থাকলে গাড়ির গতিতে জড়তা অনুভব করছেন তিনি। তার মতো লাখো গাড়িচালকের অভিযোগ, এই পরিবর্তনের ফলে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও ভোগান্তি দুই-ই বেড়েছে।
ভারত সরকারের জাতীয় জৈব জ্বালানি নীতির আওতায় ই২০ মিশ্রণের লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ সাল থেকে এগিয়ে ২০২৫ সালে নিয়ে আসা হয়েছে। গত বছর থেকেই সব পেট্রোল পাম্পে এই জ্বালানি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তবে সরকারের এই আকস্মিক পদক্ষেপে পুরনো গাড়িগুলোর ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যদিও পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তাদের দাবি, অটোমোটিভ রিসার্চ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব পেট্রোলিয়ামের গবেষণায় ই২০ মিশ্রণে ইঞ্জিনের বড় ধরনের কোনো ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি।
পরিবহন মন্ত্রী নীতিন গাদকারি এই উদ্যোগকে ভারতের পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের এক বড় মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন। তার মতে, ই২০ ব্যবহারের ফলে কৃষকদের আয় বাড়বে এবং বিদেশি জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। তবে বিরোধীদের অভিযোগ, গাদকারির পরিবারের ব্যবসায়িক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ইথানল উৎপাদনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা থাকায় এই নীতিমালা বাস্তবায়নে স্বার্থের সংঘাত রয়েছে। মন্ত্রী অবশ্য বরাবরই এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে আসছেন এবং বিষয়টিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে অভিহিত করেছেন।
জ্বালানি বিশ্লেষকদের মতে, ই২০ জ্বালানির প্রধান সীমাবদ্ধতা হলো এর তাপন মূল্য বা শক্তির ঘনত্ব সাধারণ পেট্রোলের তুলনায় কম। ফলে একই দূরত্ব অতিক্রম করতে ইঞ্জিনকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি জ্বালানি পোড়াতে হয়, যা মাইলেজ হ্রাসের অন্যতম কারণ। স্বাধীন বিশেষজ্ঞ সাজ্জাদ আহমেদ ওয়ানি বলেন, নতুন গাড়ির ইঞ্জিন ই২০-এর উপযোগী করে তৈরি করা হলেও পুরনো গাড়িগুলোর ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। ইথানলের ক্ষয়কারী প্রকৃতির কারণে গাড়ির রাবারের পাইপ, সিল ও গ্যাসকেটের মতো যন্ত্রাংশগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সরকার ই২০ জ্বালানিকে নিরাপদ দাবি করলেও জনসচেতনতার অভাব ও স্বচ্ছতার দাবি জোরালো হচ্ছে। ভোগান্তি এড়াতে গ্রাহকরা পেট্রোল পাম্পগুলোতে জ্বালানির ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য এবং পুরনো যানবাহনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে আরও বিশদ নির্দেশিকা চেয়েছেন। ব্রাজিলের মতো দেশে ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ির ব্যাপক প্রচলন থাকলেও ভারতে সেই পরিকাঠামো এখনও গড়ে ওঠেনি। তাই সরকারের এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কতটা টেকসই হয়, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা