পশ্চিম দারফুরে গণহত্যার দায়ে সুদান আরএসএফ প্রধান হেমেদতিসহ ১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড

পশ্চিম দারফুরে সংঘটিত যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার দায়ে সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস বা আরএসএফ-এর প্রধান মোহাম্মদ হামদান দাগালোসহ সংগঠনের ১৫ জন শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন পোর্ট সুদানের একটি আদালত। সেনাবাহিনী নিয়ন্ত্রিত শহরে অনুষ্ঠিত এই বিচারের রায়ে আরএসএফ প্রধান, যিনি ‘হেমেদতি’ নামে পরিচিত, তাকে অনুপস্থিতিতেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। বর্তমানে হেমেদতির অবস্থান সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা না গেলেও, আদালত তার এবং অন্য দণ্ডিতদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তাদের গ্রেপ্তারে রেড নোটিশ জারির প্রক্রিয়া শুরু করতে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের রায়ে হেমেদতির ভাই ও উপ-প্রধান আবদেলরহিম হামদান দাগালো, আরেক ভাই আল-কনি হামদান দাগালো এবং পশ্চিম দারফুরে আরএসএফ কমান্ডার আব্দুল রহমান জুমা বারকাল্লাহকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। মূলত ২০২৩ সালের জুন মাসে পশ্চিম দারফুরের গভর্নর খামিস আবাকার হত্যাকাণ্ডসহ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর পরিকল্পিত হামলা, লুটতরাজ এবং উপাসনালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর অভিযোগে এই রায় দেওয়া হয়। আরএসএফ-এর পক্ষ থেকে সরাসরি এই রায়ের বিষয়ে কোনো মন্তব্য না করা হলেও, সংগঠনটি শুরু থেকেই তাদের বিরুদ্ধে আনীত যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে সুদানের সেনাপ্রধান জেনারেল আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহান এবং হেমেদতির মধ্যকার ক্ষমতার দ্বন্দ্বে দেশটি চরম গৃহযুদ্ধের মুখে পড়ে। এক সময়ের মিত্র এই দুই বাহিনীর সংঘাতের ফলে লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে এবং দেশটিতে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। বর্তমানে আরএসএফ এবং সেনাবাহিনীর মধ্যে উত্তর কর্ডোফানের রাজধানী এল-ওবেইদ দখলের লড়াই তীব্রতর হয়েছে। শহরটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় পক্ষ মরিয়া হয়ে উঠেছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, এল-ওবেইদকে ঘিরে সংঘাতের তীব্রতা বাড়ায় প্রায় ৫ লক্ষ বেসামরিক নাগরিক ভয়াবহ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। জাতিসংঘের একটি অনুসন্ধান দল সম্প্রতি নিশ্চিত করেছে যে, আরএসএফ এল-ফাশের দখলের সময় গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং পরিকল্পিতভাবে অনাহারকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। যদিও আরএসএফ এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে, তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সংগঠনটির ওপর চাপ ক্রমাগত বাড়ছে। এমনকি ২০২৫ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্র হেমেদতির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের তদন্তকারীরাও দারফুরে সংঘটিত নৃশংসতার সঙ্গে আরএসএফ নেতৃত্বের যোগসূত্র পাওয়ার দাবি করেছেন।
সুদানের দীর্ঘদিনের শাসক ওমর আল-বশিরের পতনের পর হেমেদতি এবং বুরহান দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু আরএসএফ-কে নিয়মিত সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া এবং রাষ্ট্রক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মতভেদের জেরে তাদের এই ভঙ্গুর জোট ভেঙে যায়। সুদানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধেও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং জাতিসংঘের তদন্তে উঠে এসেছে যে, উভয় পক্ষই বেসামরিক স্থাপনা ও জনগণের ওপর নির্বিচারে আক্রমণ চালিয়েছে। আদালতের এই রায় সুদানের গৃহযুদ্ধের ইতিহাসে আরএসএফ নেতৃত্বের বিরুদ্ধে প্রথম আইনি পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, কার্যত এর প্রভাব নিয়ে সংশয় রয়েই গেছে, কারণ দণ্ডিতরা বর্তমানে দেশের বিশাল একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছেন।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা